বিশেষজ্ঞদের মত

এখন কৃষি ও কৃষককে বাঁচানোই চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। পর্যায়ক্রমে লকডাউন হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। ঘুরছে না দেশের শিল্প-কারখানার চাকা। বন্ধ হয়ে গেছে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব ব্যবসা-বাণিজ্য। এমন পরিস্থিতিতেও মাঠে কাজ করছেন দেশের কৃষক। করোনা এখন পর্যন্ত দেশের কৃষি ও কৃষককে থামাতে পারেনি। থেমে নেই কৃষিপণ্য উৎপাদন। কিন্তু কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ, ও তার ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে বাঁচাতে হবে কৃষিকে, কৃষককে আর এখন করোনা মোকবিলার পাশাপাশি এই চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। তাই উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে এর বাজার ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্যমূল্য। এর ব্যত্যয় হলে দেশের অর্থনীতির শেষ সম্বলটুকুও ধ্বংস হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্সের ওপর।

এদিকে করোনাভাইরাসজনিত উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। গত ৬ এপ্রিল কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে তার অধীন সব দফতর ও সংস্থা প্রধানদের কাছে এই নির্দেশনার চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সময়েও জরুরি পণ্য বিবেচনায় সার, বালাইনাশক, বীজ, সেচযন্ত্রসহ সব কৃষিযন্ত্র (কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ইত্যাদি) এবং যন্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ, সেচযন্ত্রসহ কৃষিযন্ত্রে ব্যবহৃত জ্বালানি ও ডিজেল, কৃষিপণ্য আমদানি, বন্দরে খালাসকরণ, দেশের অভ্যন্তরে সর্বত্র পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় যথারীতি অব্যাহত থাকার কথা বলেছে।

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধরিয়া গ্রামের তানসেন মিয়ার আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। ধানের পাশাপাশি তিনি মাছ চাষ করেন। আছে হাঁস-মুরগির খামার।

তানসেন মিয়া জানান, কয়েক একর জমির ধানে আমার সংসার খরচ মিটিয়ে বাকিটা বিক্রি করি। একইভাবে হাঁস-মুরগি ও মাছের খামার থেকেও আয় হচ্ছে। পুরো দেশে করেনাভাইরাস প্রতিরোধে কার্যত লকডাউন চললেও আমার খামারে, খেতে এবং পুকুরে তো লকডাউন নেই। সময়মতো ধান কাটতে হবে। এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। পুকুরে মাছ, খামারে হাঁস-মুরগি বড় হচ্ছে, ডিমও দিচ্ছে। সময়মতো বিক্রি করতে হচ্ছে। বিদ্যমান অবস্থায় বাজার নেই, ক্রেতা নেই, পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক নেই। চলবে কীভাবে- প্রশ্ন তানসেন মিয়ার। তাই বাধ্য হয়ে কম দামে এসব পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার মৎস্য চাষি তোবারক হোসেন জানিয়েছেন, ৫ একর জমির ওপর চারটি পুকুরে কয়েক হাজার মাছের পোনা ছেড়েছেন তিনি। সময়মতো এগুলো বিক্রি করতে হবে। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মাছের ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। দামের আশায় পুকুরে মাছ তো রেখে দেওয়া সম্ভব নয়। সময় হলে এগুলো বিক্রি করতে হবে। কিন্তু ক্রেতার অভাবে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না তারা। তাই নিশ্চিত লোকসানের কবলে পড়বেন।

টঙ্গীর বোর্ডবাজার এলাকায় মুরগির খামারি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গণপরিবহন বন্ধ থাকার কারণে ক্রেতা আসতে পারছে না। অর্ডার থাকলেও চালক ও হেলপার না থাকায় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় মুরগিও সরবরাহ করতে পারছি না। এমন অবস্থায় সকাল হলেই আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকি, যদি কোনো ক্রেতা আসেন। এখন দরদাম করার সুযোগ নেই। চাহিদা কম বলে অধিকাংশ সময় ক্রেতা যে দাম বলে সেই দামেই মুরগি ও ডিম বিক্রি করি। দাম যাচাই করার সুযোগ নেই। কারণ ক্রেতা ফিরিয়ে দিলে তো পুরোটাই লোকসান। এ অবস্থা চলতে থাকলে কত দিন টিকে থাকব কে জানে?

একইভাবে ক্রেতার অভাবে পানির দামে দুধ বিক্রি করছেন সিরাজগঞ্জের খামারিরা। তাই অনেকটাই পানির দামে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার লোকমান হোসেন নামের একজন দুগ্ধ খামারি জানিয়েছেন, করোনার প্রভাবে দুধ কিনছেন না সমবায়ীরা। বাজারে এখন এক লিটার বোতলজাত পানির দাম ২৫ টাকা, কিন্তু উল্লাপাড়ায় দুধ বিক্রি করছি ২০ থেকে ২৫ টাকা লিটার দরে। অথচ কয়েক দিন আগেও উল্লাপাড়ার হাটবাজারে প্রতি লিটার দুধ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, দেশব্যাপী মিষ্টির দোকান বন্ধ থাকায় দুধের চাহিদা কমে গেছে। লোকজন ভয়ে আতঙ্কে বাইরের কারো কাছ থেকে দুধ কিনতে রাজি হচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যেভাবেই হোক, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বাজার ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এটা করা না গেলে অর্থনীতি পুরোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেকোনো উপায়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে কৃষিকে, বাঁচাতে হবে কৃষককে। অর্থনীতির প্রধান তিন খাত কৃষি, গার্মেন্ট ও রেমিট্যান্স। গার্মেন্ট ও রেমিট্যান্স সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জড়িত বলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছে, সেক্ষেত্রে আমাদের অর্থনীতির মেরুদ- কৃষির প্রতিই রাখতে হবে ভরসা। বর্তমানে আমাদের জিডিপিতে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ অবদান রাখছে কৃষি খাত।

এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আবুল মাকসুদ জানিয়েছেন, করোনার কারণে এখন দেশ প্রায় অবরুদ্ধ। কৃষক তার ফসল নিয়ে পড়েছেন ভীষণ বিপাকে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বব্যাপী শুধু যে মানুষের জীবন বিপন্ন তা-ই নয়, শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত, ব্যবসা-বাণিজ্যেও ধস নেমেছে। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের ওপর করোনার আঘাত মারাত্মক। তবে রফতানিমুখী শিল্প-বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেলেও কৃষি ও কৃষকের সমস্যা ও দুর্দশার ব্যাপারে রাষ্ট্রযন্ত্র এখনো নীরব। গণপরিবহন, রেল যোগাযোগ ও নৌপরিবহন বন্ধ থাকায় কৃষিজাত পণ্য তথা কৃষকের যে ক্ষতি, তা অপরিমেয়। এর জন্য বাজার প্রয়োজন, ক্রেতা প্রয়োজন এবং পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রয়োজন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক গোলাম মোয়াজ্জেম জানিয়েছেন, কৃষককে বাঁচাতে হবে। করোনায় সব বন্ধ হয়ে গেলেও কৃষি কিন্তু থেমে নেই। বোরো উঠতে শুরু করেছে। রবিশস্যও উঠবে। পোলট্রি শিল্পে ডিম ও মাংস উৎপাদন হচ্ছে। মাছ ও গরুর খামারেও উৎপাদন হচ্ছে। এসব পণ্য বাজারজাত করতে না পারলে এ সেক্টর ধসে যাবে। কৃষি খাত ধসে গেলে অর্থনীতি মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়বে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত ও সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিতে হবে। এটি করা না গেলে কৃষি ও কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

 

"