তৈজসপত্রে নতুন সম্ভাবনা

২৪৫ মিলিয়ন টন সাদামাটির সন্ধান

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নতুন করে দেশের নানা প্রান্তে আরো ২৪৫ মিলিয়ন টন সাদামাটির সন্ধান পেয়েছে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর (জিএসবি)। সাদামাটি আধুনিক জীবনযাত্রার প্রয়োজনের নিরিখে একটি বিশেষ প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ। ঘর গৃহস্থালির নানাবিধ তৈজসপত্র, রিফ্রাকটরিজ, সিরামিক, টাইলস ইত্যাদি ছাড়াও ইনসুলেটর, ওষুধ, কাঁচ ও কাগজ শিল্পে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। দেশের সাদামাটিতে সিলিকন, অ্যালুমিনিয়াম, আয়রন, টিটেনিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে। বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এলাকার পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে পাললিক শিলাস্তরে প্রচুর সাদামাটির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে বলে দাবি জিএসবির।

জিএসবি সূত্র জানান, টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরে ১২৫, জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে ১০, হবিগঞ্জের মাধবপুরে ৬৮, বাহুবলে ২, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় ২৫ ও নেত্রকোনার বিজয়পুরে ২৫ মিলিয়ন টন সাদামাটি মজুদ আছে। এছাড়াও দিনাজপুরের মধ্যপাড়া, দিঘীপাড়া ও নওগাঁর পতœীতলায় মিলেছে সাদামাটির সন্ধান।

বাংলাদেশের সাদামাটির মান ভালো। শুধু পাহাড়ি এলাকায় নয়, হবিগঞ্জের সমভূমিতেও সাদামাটির সন্ধান পাওয়া গেছে। সারা দেশে জরিপ পরিচালনা করলে সাদামাটির আরো সন্ধান মিলবে। এতে শিল্পের নতুন দ্বার উন্মোচনের পাশাপাশি সাদামাটি আমদানি নির্ভরতা কমবে বলে জানায় জিএসবি।

জিএসবি জানায়, স্থানীয়ভাবে স্বল্প পরিসরে সাদামাটি ব্যবহার করা হয়।

জিএসবির পরিচালক (ভূতত্ত্ব) মোহাম্মদ আলী আকবর বলেন, সাদামাটির ব্যবহার নানাভাবে হয়ে থাকে। গৃহস্থালি সামগ্রী ও ওষুধ শিল্পের জন্য আমাদের সাদামাটির মান ভালো। শুধু পাহাড়ের ভাঁজ বা পাদদেশে নয়, সমভূমিতেও সাদামাটি পেয়েছি। তাই সারা দেশে সার্ভে করলে আমরা মাটির ভাঁজে ভাঁজে সাদামাটি পেতে পারি। ফলে একদিকে যেমন শিল্পের প্রসার ঘটবে, অন্যদিকে আমদানি নির্ভরতাও কমবে।

সাদামাটি সন্ধান, উত্তোলন ও বিপণনে সাত সদস্যের জেলা কমিটি রয়েছে। এই কমিটি সাদামাটি কোয়ারি ইজারা দেওয়া, উত্তোলনসহ সব কাজ করে থাকে। দেশের নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলার দুর্গাপুর, ধোবাউড়া, হালুয়াঘাট, শ্রীবর্দী, নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতি উপজেলায় সাদামাটির মজুদ রয়েছে। ছয়টি উপজেলায় পাহাড় ও সমতলে ৩৫০ মিলিয়ন টন সাদামাটি মজুদ রয়েছে।

নতুন করে পাওয়া ২৪৫ মিলিয়ন টন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে জানায় জিএসবি। সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশে সাদামাটি মজুদের পরিমাণ দাঁড়াল ৫৯৫ মিলিয়ন টন।

তবে দেশের খনিজ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা এখনো সম্ভব হয়নি। খনিজ সম্পদের মধ্যে শুধুমাত্র গ্যাসের ব্যবহারে মনোযোগ দেওয়া হলেও অন্যগুলোর ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। গ্যাসের পর কয়লার প্রমাণিত মজুতের হিসাব থাকলেও খনিজ সম্পদের সঠিক হিসাব নেই কারো কাছে।

ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের সূত্র বলছে, সাত ধরনের খনিজের একটি সম্ভাব্য মজুত তারা নিশ্চিত হতে পেরেছে। তবে তা প্রমাণিত নয়। আর প্রমাণিত মজুত আবিষ্কারের আগে খনিজ সম্পদের সঠিক ধারণা দেওয়া কঠিন। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের (জিএসবি) হিসেবে যে খনিজগুলোর সম্ভাব্য মজুতের কথা বলা হচ্ছে সেগুলো হলো পিট, চুনাপাথর, সাদামাটি, কঠিন শিলা, কাচবালি এবং নুড়িপাথর। এসব খনিজ কী পরিমাণ থাকতে পারে তারও সম্ভাব্য পরিমাণ নিরূপণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি এমন খনিজ পদার্থ রয়েছে চারটি। এগুলো হচ্ছে ভারি খনিজ মানিক, খনিজ বালি, নুড়ি মিশ্রিত বালি ও ধাতব খনিজ।

সমুদ্রসৈকতের বালি থেকে মানিক পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলে আসছে জিএসবি। এছাড়া খনিজ বালি আবিষ্কারের কথাও বলা হচ্ছে যা নদীর অববাহিকার বালিতে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে নুড়ি মিশ্রিত বালি এবং ধাতব খনিজ রয়েছে। দেশের কিছু স্থানকে এসব খনিজ সম্পদ পাওয়ার উপযোগী বলেও ঘোষণা করেছেন তারা। সম্প্রতি উত্তরের একটি জেলায় লোহার খনি পাওয়ার সম্ভাবনার কথা প্রকাশ করে জিএসবি। তবে এখনো তা কতটা সঠিক সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছুই বলেনি সংস্থাটি।

দেশে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের কাজ করে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর জিএসবি। আর খনির অর্থনৈতিক উন্নয়নের দায়িত্ব পেট্রোবাংলার। বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (বিওজিএমসি) সঙ্গে অঙ্গীভূত হওয়ার আগ পর্যন্ত খনিজ বিষয়ক কার্যক্রম বাংলাদেশ মিনারেল এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের (বিএমইডিসি) ওপর ন্যস্ত ছিল। পেট্রোবাংলা এ পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ দুটি খনি উন্নয়ন করেছে। একটি হলো বড়পুকুরিয়ার কয়লা, যার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ২০০৫ সালে এবং অন্যটি মধ্যপাড়ায় গ্রানাইট মাইন, যার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ২০০৭ সালে। এছাড়া, সরকার ব্যুরো অব মিনারেল ডেভেলপমেন্টের (বিএমডি) মাধ্যমে চুনাপাথর, হোয়াইট ক্লে ও বোল্ডার আহরণের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, যে পরিমাণ সম্পদ আমাদের আছে আমরা তা ব্যবহার করি না। ব্যবহার করলে আমাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরো ভালো হতো। এ কারণেই আমাদের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

"