গভীর সংকটে দুগ্ধশিল্প

* সাড়ে ৩ লাখ খামারির মাথায় হাত * প্রয়োজন জরুরি প্রণোদনা * গুঁড়া দুধ বানানোর পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়ার পাশাপাশি বিক্রি কমে যাওয়ায় গভীর সংকটে পড়েছে দেশের দুগ্ধ শিল্প। প্রতিদিন দেশে উৎপাদিত হওয়া ২৭ হাজার মেট্রিক টন দুধ খামারিরা না পারছেন বেচতে না পারছেন ফেলে দিতে। কোথাও কোথাও পানির দামে দুধ বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। এর ওপর গাভীর খাবারের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এসব খামারিদের। এই অবস্থায় দেশের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ দুগ্ধ খামারি আছেন বিপদের মধ্যে।

সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই খামারিদের বাঁচিয়ে রাখতে এখনই জরুরি ভিত্তিতে নগদ প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি প্রকিয়াজাতকরণ কোম্পানিগুলো দিয়ে দুধ সংগ্রহ করে তা বাষ্পায়িত করে যত বেশি সম্ভব গুঁড়া দুধ বানানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে বিপণনের পথ সংকুচিত হওয়ায় পাস্তুরিত দুধ উৎপাদনকারী অনেক বড় কোম্পানিও বিপাকে পড়েছে বলে তাদের ভাষ্য। জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির অন্যতম জোগান হিসেবে বিবেচিত দুগ্ধ পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ ডেইরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিওএ) সভাপতি শাহ ইমরান বলেন, দেশে ডেইরির সার্বিক অবস্থা এখন খুবই খারাপ।

কতটা খারাপ অবস্থা সেই ধারণা পাওয়া যায় ফরিদপুরের বোয়ালমারীর খামারি কাশেম আলীর কথায়। তার মার্শ এগ্রো নামের খামারে রয়েছে ২০টি গাভী, সঙ্গে কয়েকটি বাছুর ও চারটি ষাড়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে খামারের গরুগুলো এখন তিনি স্বাভাবিকের তুলনায় অর্ধেক খাবার দিতে পারছেন। আমাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হচ্ছে। বেশিরভাগ দুধ মিষ্টির দোকানে দিতাম। সেসব দোকান অধিকাংশই বন্ধ। শহরে নিয়ে কিছু দুধ বিক্রি করছি। কিন্তু দাম একদমই কমে গেছে। আগের থেকে তিন ভাগের এক ভাগ দামে দুধ বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। এর ওপর আছে দানাদার খাবারের সংকট। লকডাউনের মধ্যে পশু চিকিৎসক পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান ওই খামারি।

দুধ যা বিক্রি হচ্ছে না তা ক্রিম করে রাখছি পরে ঘি করব। ক্রিম করে ২ মাস পরে বিক্রি করব। কিন্তু আমার টাকা লাগবে এখন। গাভীকে খাওয়াতে হবে। মাঝে কিছু দিন মিল্কভিটা দুধ নিত না এখন নিচ্ছে। কিন্তু আগে যেখানে ২০০০ লিটার নিত এখন নিচ্ছে ৫০০ লিটার। খামার যেন বন্ধ করে দিতে না হয় সেজন্য এখনই সরকারের সহায়তা চান কাশেম আলী।

বিডিওএ সভাপতি ইমরান বলেন, লকডাউনের পর সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে তারা মিষ্টির দোকান বন্ধ না করতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তার আগেই সব ডিসির কাছে দোকানপাট বন্ধের চিঠি পৌঁছে গিয়েছিল। পরে আমাদের বার্তাটা ডিসিদের সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের মনে হয়নি। মফস্বলে অনেক দোকান প্রশাসন খুলতে দেয়নি। সেসব জায়গার খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়েছে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে দেশের এই পরিস্থিতিতে মিষ্টিই বা কে খাবে? ক্রেতাই তো নেই।

ইমরান বলেন, বেচতে না পেরে অনেক দুধ ফেলে দিতে হচ্ছে খামারিদের। কেউবা ১০-১৫ টাকায় হাতে পায়ে ধরে মানুষকে দিচ্ছে। পশুগুলোকেও খাওয়াতে পারছি না। লোকসানের বোঝা প্রতিদিন বাড়ছে। এই পরিস্থিতি ঠেকায় পড়লে খামারিদের গরু বিক্রি করারও উপায় নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, দেশে শুধু দুগ্ধ খামারের সংখ্যাই প্রায় সাড়ে ৩ লাখ। গড়ে ১০ লিটার দুধ দেয় এমন গাভীর পেছনে দিনে প্রায় ২৫০ টাকা খরচ হয়। খামারিরা এখন এই টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বাংলাদেশে বছরে ৯৯ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদন হয়। প্রতিদিন হয় ২৭ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে বেশিরভাগ কেনে মিষ্টির দোকান। এরপর বাসায় দুধ নেয় এবং বাজার থেকে কেনে। মিষ্টির দোকান তো বেশিরভাগই বন্ধ। বাসাবাড়িতে দুধ নিতে পারে না। বাইরে তো বাজারে মানুষ যেতেই পারছে না। সাধারণ ক্রেতাদের কেনার জন্য ছোট ছোট দোকানে যেখানে দুধ রাখা হতো সেগুলো বন্ধ। কাজেই দুধ বিক্রির বড় যে সুযোগগুলো ছিল সেগুলো এখন বন্ধ।

জাহাঙ্গীর আলম জানান, মোট উৎপাদিত দুধের ৫ থেকে ১০ শতাংশ সংগ্রহ করে পাস্তুরিত বা প্রক্রিয়াজাত করে যেসব কোম্পানি তারাও সংগ্রহ ও বিক্রি কমিয়ে দিয়েছে। কাজেই সত্যিকার খামারিরা দুধ বিক্রি করতে পারছে না। না বাজারে যেতে পারছে, না মিষ্টির দোকানে বিক্রি করতে পারছে। অধিকাংশই অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে। ৫০ থেকে ৬০ টাকা লিটার দুধ ১৫ থেকে ২০ টাকায় নেমে গেছে। তারপরও দুধ বিক্রি করতে পারছে না। দুধ বিক্রি না করতে পেরে কিছু কিছু খামারি ঘি, মাখন, ছানা তৈরি করে রাখছেন। কিন্তু সেটাও বেশি দিন রাখা সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন বিএলআইআরএর সাবেক মহাপরিচালক।

 

"