করোনায় বদলেছে ঢাকার ৪ নদীও

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনায় বিপর্যস্ত যখন পৃথিবীর মানুষ, তখন প্রকৃতি যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে তার ওপর চলতে থাকা নির্যাতন থেকে। পৃথিবীর অনেক শহরের মতো বদলেছে ঢাকার চিত্রও। পুরোপুরি না হলেও একটু একটু করে পাল্টাচ্ছে ঢাকার চারপাশের নদীর পানিও। করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে প্রকৃতি ছিল মানুষের কাছে বন্দি। এখন তারা ঘর বন্দি হওয়ায় প্রকৃতি ফিরে এসেছে স্বমহিমায়। বিশ্বের অনেক ব্যস্ত শহরের নদীর মতো না হলেও, কিছুটা বদলাচ্ছে ঢাকার চারপাশের নদীর চিত্র। কলকারখানা বন্ধ থাকায় অপরিশোধিত তরল ও কঠিন বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় গড়াচ্ছে না। ডিঙি নৌকায় মানুষ পারাপারের দৃশ্যেরও দেখা মিলছে কদাচিৎ। অন্যদিকে ঘাটে ভিড়ে থাকা নৌযানগুলো থেকে মাঝেমধ্যেই ফেলা হতো খাবারের পরিত্যক্ত মোড়ক, ফলের খোসা, বোতলসহ নানা বর্জ্য; এখন সেসব দূষণও বন্ধ। তবে রাজধানীর সুয়ারেজ বর্জ্য ঠিকই পড়ছে নদীতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুম বাদে সারা বছরই বুড়িগঙ্গায় যে পানি থাকে তাতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ থাকে সর্বনিম্ন। পানি রং ধারণ করে একেবারে কুচকুচে কালো। বুড়িগঙ্গা পরিণত হয় আবর্জনার ভাগাড়ে। তবে এখন কলকারখানা বন্ধ থাকায় ও মানুষের যাতায়াত কমে যাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে নদীটি। করোনায় সবকিছু বন্ধের প্রভাব পড়েছে তুরাগেও। বিশ্বের অনেক ব্যস্ত শহরের পাশের নদীর মতো না হলেও, কিছুটা বদলাচ্ছে তুরাগের দূষণ। ঢাকার আরেক নদী ধলেশ্বরী। ট্যানারি শিল্প হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুর নেওয়ার পর এমন ধলেশ্বরী দেখেনি দেশের মানুষ। ট্যানারি বন্ধ থাকায় কয়েক দিনেই পুরোপুরি বদলে গেছে নদীর চিত্র। যেন নতুন প্রাণ ফিরেছে এই স্রোতস্বিনী। নদীদূষণ নিয়ে গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান রিভাইন পিপলসের সমীক্ষা বলছে, বুড়িগঙ্গা পাড়ে প্রায় ৩০টি, তুরাগের পাড়ে ৩০টি, টঙ্গি খালের ২০টি কলকারখানা এবং ধলেশ্বরীর ট্যানারির বর্জ্যে দূষণ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। তবে এগুলোর পক্ষে এককভাবে নদীগুলো দূষণ করা পুরোপুরি সম্ভব নয়। মূলত গাজীপুর জেলার শত শত কলকারখানা, গার্মেন্টস ও ইপিজেডের বর্জ্য ঢাকার নদীগুলোর পানিকে দূষিত করে, যা সরাসরি গিয়ে মিলিত হয় মেঘনায়। করোনাভাইরাস নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে বর্জ্য ও দূষণ থেকে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে নদীগুলো। পরিবেশবিদদের মতে, এটি স্থায়ী কোনো সমাধাণ নয়। লাগাম ছাড়া এই নদীদূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জরুরি।

পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, সবচেয়ে দূষিত নদী বুড়িগঙ্গা। এরপর তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা। দখলদার ও শিল্প মালিকদের কবলে পড়ে দখল-দূষণে মরতে বসেছে নদীগুলো। ঢাকার এই চারটা নদীর পানিকে চাইলে এখনো ঠিক করা সম্ভব। করোনা পরিস্থিতি সবাইকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কথিত আছে, প্রাচীনকালে গঙ্গা নদীর একটি প্রবাহ ধলেশ্বরী হয়ে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিশেছিল। সময়ের পরিক্রমায় প্রাকৃতিক কারণে প্রবাহটির গতিপথ পরিবর্তন হয়। ফলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় গঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগ। পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্ন প্রবাহটি বুড়িগঙ্গা নামে পরিচিতি পায়। মূলত ধলেশ্বরী নদী থেকেই বুড়িগঙ্গার উৎপত্তি হওয়া এ নদীটি এখন মানুষেরই অত্যাচারে আজ মরতে বসেছে। অথচ ১৮০০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক আবাসিক প্রতিনিধি জন টেইলর বুড়িগঙ্গা নদীর রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন, বর্ষাকালে যখন বুড়িগঙ্গা পানিতে ভরপুর থাকে, তখন দূর থেকে ঢাকাকে দেখায় ভেনিসের মতো।

ঢাকার আরেক নদী ধলেশ্বরী। ট্যানারি শিল্প হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুর নেওয়ার পর এমন ধলেশ্বরী দেখেনি দেশের মানুষ। ট্যানারি বন্ধ থাকায় কয়েক দিনেই পুরোপুরি বদলে গেছে নদীর চিত্র। যেন নতুন প্রাণ ফিরেছে এই স্রোতস্বিনী।

সর্বোচ্চ দূষিত বায়ুমানের তকমা থেকেও এ সময়ে মুক্তি মিলেছে রাজধানী ঢাকার। যদিও ধুলাহীন, সজীব সতেজ প্রকৃতির এই নতুন রূপ অদেখা রয়ে যাচ্ছে সবার। করোনার আতঙ্ক জয় করে আবার মানুষ ফিরবে তার আপন রূপে, সেদিন মনে থাকবে কি স্বরূপে ফেরা এ প্রকৃতির কথা?

 

"