লোকসানের মুখে দুধ-খামারিরা

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

দেশে করোনাভাইরাসের আতঙ্কে তরল দুধের চাহিদা কমে গেছে। বাঘাবাড়ী মিল্কভিটাসহ প্রায় ২০টি বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। এতে করে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের প্রায় দেড় লাখ গো-খামারি ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন। অনেক খামারি তাদের উৎপদিত দুধ রিকশাভ্যানে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে ২০ থেকে ২৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। এছাড়া ননফ্যাট দুধ প্রতি লিটার ৫ থেকে ৭ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে উৎপাদিত দুধের দাম কম, গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, অব্যাহত লোকসানসহ নানা কারণে এ অঞ্চলের অনেক গো-খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

জানা গেছে, ১৯৭৩ সাল থেকে পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাংগুড়া, চাটমোহর এবং সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলা নিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ দুগ্ধ অঞ্চল গড়ে উঠে। সিরাজগঞ্জ-পাবনা অঞ্চলে প্রায় ৮০ হাজারের বেশি গো-খামার রয়েছে। এ ছাড়া গ্রামগুলোর প্রায় প্রতিটি বাড়িতে গরু পালন করে দুধ উৎপাদন করা হয়। গড়ে এ অঞ্চলে প্রতিদিন ১৫ থেকে সাড়ে ১৬ লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে দেড় লাখ লিটার বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা, আফতাব, আকিজ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান চার লাখ ৫০ হাজার লিটার এবং প্রাণ এক লাখ লিটার দুধ ক্রয় করে সারা দেশে বাজারজাত করে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানের দুধ সংগ্রহের পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ লিটার। এছাড়া ঘোষেরা ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটার দুধ ক্রয় করে থাকে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অবশিষ্ট দুধ প্রক্রিয়াজাত করে বগুড়া, রংপুর, নাটোর, নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করে থাকেন। সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দুধ ক্রয় কমিয়ে দিয়েছে। মিষ্টি ও চায়ের দোকান বন্ধ থাকায় তারা দুধ কিনছে না। ফলে উৎপাদিত দুধ নিয়ে খামারিরা বিপাকে পড়েছেন।

শাহজাদপুর উপজেলার পোঁতাজিয়া প্রাথমিক দুগ্ধ সমবায় সমিতির সভাপতি ওয়াজেদ আলী জানিয়েছেন, দুধ থেকে ননী বা ফ্যাট বের করে নেওয়ার পর ননফ্যাট দুধ বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৭ টাকা লিটার দরে। অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনাটি সত্য। বাজারে ক্রেতা নেই। তাই খামারিরা কিছুটা লোকসান ঠেকাতে দুধ থেকে মেশিনের সাহায্যে শতভাগ ফ্যাট তুলে নিচ্ছে। এরপর সেই ননফ্যাট দুধ ৫ থেকে ৭ টাকা লিটার দরে বিক্রি করছে। এতে অল্প আয়ের মানুষ সহজেই দুধ কিনে খেতে পারছেন।

এদিকে পোঁতাজিয়া প্রাথমিক দুগ্ধ সমবায় সমিতির সভাপতি ওয়াজেদ আলীর বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন, সাঁথিয়া উপজেলার সরিষা গ্রামের অভিজ্ঞ ঘি ও ছানা প্রস্ততকারক সাধন কুমার ঘোষ। তিনি বলেছেন, আমরা ঘি তৈরির জন্য দুধ থেকে শতভাগ ফ্যাট তুলে নেওয়ার অবিকল দুধের মতো দেখতে সাদা পানি ফেলে দেই। শতভাগ ফ্যাট তুলে নেয়ার পর এতে কোনো পুষ্টি উপাদান থাকে না। ফলে এই ননফ্যাট দুধ পান করে মানুষের কোনো উপকার হয় না। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ননফ্যাট দুধ বিক্রি করে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে।

খামারিরা জানিয়েছেন, দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে অফিস আদালত বন্ধ রয়েছে। ফলে মানুষজন ঢাকাসহ বড় বড় শহর ছেড়ে গ্রামে পাড়ি জমিয়েছে। এতে শহরগুলোতে দুধের চাহিদা কমে গেছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জ-পাবনা এলাকায় ছানা তৈরির কারখানা ও মিষ্টির দোকানও বন্ধ থাকায় এসব কারখানা দুধ কিনছে না। এ এলাকায় শতাধিক ছানা তৈরির কারখানায় প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটার দুধের প্রয়োজন হোত।

খামারিদের অভিযোগ, দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই হলো খামারি ও কৃষকদের দুধ বিক্রি করার প্রধান ভরসা। কিন্তু বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান দুধ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। প্রাণ ডেইরি গুঁড়ো দুধ তৈরির জন্য এক লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। মিল্কভিটা প্রতিদিন বিকেলে মাত্র ৪৫ হাজার লিটার দুধ নিয়ে গুড়ো দুধ তৈরী করছে। অবশিষ্ট ৭ লাখ লিটার দুধ নিয়ে কৃষকেরা বিপাকে পড়েছেন। কৃষকদের দাবি, প্রতি লিটার দুধের উৎপাদন খরচ পড়ছে ৪২ টাকা। কিন্তু দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি লিটার দুধের দাম দিচ্ছে ৩৬ থেকে ৩৮ টাকা। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত খামারিরা ছাড়া অন্যকেউ দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দুধ বিক্রি করতে পারে না।

সরকারি দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী সমবায়ী প্রতিষ্ঠান বাঘাবাড়ী মিল্কভিটার আওতাধীন শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি ওয়াজ আলী জানান, মিল্কভিটা বন্ধ থাকায় তাদের সমিতিভুক্ত কৃষকেরা উৎপাদিত দুধ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। ক্রেতার অভাবে তারা পানির দামে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে লোকসানের মুখে পড়েছেন সিরাজগঞ্জ-পাবনা অঞ্চলে গো-খামারি ও কৃষকরা।

ভাঙ্গুড়া দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রাথমিক সমবায় সমিতির সভাপতি ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, পাবনার ভাঙ্গগুড়া ও চাটমোহর উপজেলার কৃষকরা ৩০ থেকে ৩৫ টাকা দরে দুধ বিক্রি করছেন। আবার কিছু কিছু এলাকায় ২৫ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। দুগ্ধশিল্পকে টিকিয়ে রাখা স্বার্থে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ও চাষিদের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। তাছাড়া এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। অব্যাহত লোকসানে অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সরকারি দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা পরিচালনা পরিষদের পরিচালক আবদুস সামাদ ফকির বলেছেন, বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা কারখানা দুধ কেনা বন্ধ থাকায় শিল্কশেড এরিয়ার খামারি ও চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এখন প্রতিদিন বিকালে ৪৫ হাজার লিটার দুধ নেওয়া হচ্ছে। এতে খামারিরা কিছুটা হলেও উপকৃত হচ্ছেন।

বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা কারখানার ডিজিএম ডা. ইদ্রিস আলী জানান, করোনার প্রভাবে সরকারি নির্দেশে ফ্যাক্টরি বন্ধ ছিল। আবার সরকারি নির্দেশে এক বেলা খোলা রাখা হয়েছে। সরকার আবার নির্দেশ দিলে ফ্যাক্টরি পুরোদমে চালু করা হবে। করোনার প্রভাবে বাজারে দুধের চাহিদা কমে গেছে। তারপরও কৃষকদের লোকসানের কথা ভেবে কারখানা এক বেলা চালু রাখা হয়েছে। তবে ৯০০ মেট্রিক টন উৎপাদিত গুঁড়াদুধ অবিক্রীত অবস্থায় রয়েছে।

 

"