করোনাভাইরাসে জানা অজানা ও করণীয়

প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশেও গতকাল পর্যন্ত ২০ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে জানা গেছে। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে অপরকে সচেতন করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু ভিত্তিহীন খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই কারণে করোনাভাইরাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা দরকার।

শুরু করা যাক সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরগুলো দিয়ে। একটি পোস্ট বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সেটি হলো ‘করোনাভাইরাস চারদিন পর্যন্ত গলায় আটকে থাকে, গরম পানি খেলে ভাইরাস চলে যাবে।’ প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক মানুষের শরীর কীভাবে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়। খুব সহজ ভাষায় কোভিড-১৯ এর গঠনের কথা বললে, এই ভাইরাসের বাইরে থাকে তৈলাক্ত লিপিড অণুর আবরণ (সাবানের সংস্পর্শে যা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে)। ভাইরাস নাক, মুখ বা চোখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে, তারপরে শ্বাসনালির কোষগুলোতে সংযুক্ত হয়। ভাইরাসটি কোষের মেমব্রেনের সঙ্গে তার তৈলাক্ত মেমব্রেনটি ফিউজ করে কোষকে সংক্রমিত করে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ২ থেকে ১৪ দিন সময় লাগলেও, সংক্রমণের শুরু ভাইরাস শরীরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, কোষে ভাইরাসটির আরো অনুলিপি তৈরি হয়। ভেঙে যাওয়ার এবং মরে যাওয়ার আগে, প্রতিটি সংক্রমিত কোষ ভাইরাসটির কয়েক মিলিয়ন কপি তৈরি করে। ভেঙে যাওয়া সংক্রমিত কোষ থেকে বের হওয়া ভাইরাসগুলো কাছের কোষগুলোকে সংক্রমিত করতে পারে বা হাঁচি-কাশির ফোঁটার মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে আসতে পারে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসটি পরিষ্কার করার জন্য লড়াই করার কারণে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণে জ্বর হয়। মারাত্মক ক্ষেত্রে, প্রতিরোধ ব্যবস্থা ফুসফুসের কোষগুলোকে আক্রমণ করে। ফুসফুসে জমা তরল এবং মরে যাওয়া কোষগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, ফলে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। তীব্র সংক্রমণের ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

ওপরের করোনাভাইরাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণের মাধ্যমে বোঝা যায় ভাইরাস চার দিন পর্যন্ত গলায় কিছু না করে বসে থাকবে না। আর এ ধরনের ভাইরাস সাধারণত ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে মারা যাওয়া শুরু করে। আর মনে রাখবেন ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি গরম পানি খাওয়া মানুষের জন্য বিপজ্জনক। সেটি যদি আপনি করেনও, শতভাগ ভাইরাস আপনি মারতে পারবেন না। আরো একটি পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ‘রসুন সেদ্ধ পানি খেলে করোনাভাইরাস থেকে বাঁচা যাবে। সকালে খেলে রাতের মধ্যে কাজ হবে’Ñ এ ধরনের তথ্যের কোনো প্রমাণ নেই। আর একটি বিষয় মনে রাখবেন, এটি যদি প্রমাণিত হয়, তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নয়, নেচার/সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হবে। কিছু গবেষণা মতে, রসুনের অ্যান্টিবায়োটিক বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই যে এটি কোভিড-১৯ এর হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে। আর মনে রাখবেন, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে কিন্তু ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। মানুষের জন্য স্বস্তির খবর হলো ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের সিয়াটলে একটি গবেষণা কেন্দ্রে মনুষের শরীরে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই খবরের সঙ্গে আরো একটি খবর ছড়িয়ে পড়েছে যা পুরোপুরি সত্য নয়। মানুষ মনে করছে, আগমীকাল বা আগামী সপ্তাহ থেকে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এই ভ্যাকসিনটি কাজ করবে কিনা তা জানতে এখনো অনেক মাস সময় লাগবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ ধরনের অনেক ভুল ও ভিত্তিহীন খবর বিশ্বাস না করে আমদের যেটা করা উচিত সেটা হলো নিজে সচেতন হওয়া এবং অপরকে সচেতন করা। যেহেতু আমদের দেশে এরই মধ্যে ২০ জন ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তাই সরকারের উচিত এটি ছড়িয়ে পড়া কীভাবে আটকানো যায় সেটা নিয়ে চিন্তা করা। অন্যকিছু দেশের মতো, কমপক্ষে ১৪ দিন ইমার্জেন্সি কিছু ছাড়া বাকি সব কিছু বন্ধ করা যেতে পারে।

কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন সে ব্যাপারে আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং আমাদের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া বেশ কিছু জনসচেতনতামূলক তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরা হলো।

এই ভাইরাসটি মূলত মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। কাছাকাছি থাকা মানুষের মধ্যে (প্রায় ছয় ফুটের মধ্যে) ছড়িয়ে পড়তে পারে। যখন সংক্রামিত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দেয়, তখন বের হওয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের ফোঁটাগুলোর মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ছড়ানো ফোঁটাগুলো কাছাকাছি থাকা মানুষের নিঃশ্বাসের মাধ্যমে তাদের ফুসফুসে যেতে পারে। করোনাভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ নিন। আপনার হাত নিয়মিত পরিষ্কার করুন। কমপক্ষে ২০ সেকেন্ডের জন্য আপনার হাত নিয়মিত সাবান এবং পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। বিশেষত আপনি ঘরের বাইরে থাকার পরে এবং কাশি বা হাঁচি দেওয়ার পরে। যদি সাবান এবং পানি সহজে না পাওয়া যায় তবে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ অ্যালকোহল আছে এমন হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন। আপনার হাতে এটি লাগিয়ে শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত দুই হাত একসঙ্গে ঘষতে থাকুন। হাত না ধুয়ে আপনার চোখ, নাক এবং মুখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। জনসমাগম হতে পারে এমন সবকিছু এড়িয়ে চলুন। অসুস্থ মানুষের কাছাকাছি যাবেন না, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রচুর পানি এবং পানিজাতীয় খাবার খান রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ঠিক রাখার জন্য। অন্যকে রক্ষা করার পদক্ষেপ নিন। আপনি অসুস্থ হলে বাড়িতেই থাকুন, চিকিৎসা নেওয়া ছাড়া। প্রয়োজন মনে হলে আইইডিসিআরের হেল্প লাইনে ফোন করুন। আপনি যখন কাশি বা হাঁচি দেন, তখন আপনার মুখ এবং নাক আপনার কনুইয়ের অভ্যন্তরভাগ ব্যবহার করে অথবা টিস্যু দিয়ে ঢেকে রাখুন। ব্যবহৃত টিস্যু দ্রুত ডাস্টবিন ফেলে দিন। দ্রুত আপনার হাত সাবান এবং পানি দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ডের জন্য ধুয়ে ফেলুন। যদি সাবান এবং পানি সহজেই পাওয়া না যায় তবে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত একটি স্যানিটাইজার দিয়ে আপনার দুই হাত পরিষ্কার করুন। আপনি অসুস্থ হলে অবশ্যই ফেসমাস্ক পরুন। প্রতিদিন প্রায়শই স্পর্শ করা জিনিষগুলোকে পরিষ্কার করুন এবং জীবাণুনামুক্ত করুন। এর মধ্যে রয়েছে টেবিল, দরজার হ্যান্ডেল, ইলেকট্রিক সুইচ, কাউন্টারটপস, ফোন, কিবোর্ড, পানির কল ইত্যাদি। ৭০ শতাংশ অ্যালকোহল অথবা ব্লিচিং ব্যবহার করতে পারেন। এগুলো কীভাবে পরিষ্কার রাখা যায় সে ব্যাপারে ইউটিউবে অনেক ভিডিও রয়েছে, বিশেষত ইলেকট্রনিক সরঞ্জমাদির ব্যাপারে।

শিগগিরই আসতে পারে করোনাভাইরাসের ওষুধ : বিখ্যাত নেচার সেল ডিসকভারি জার্নালে আজকেই প্রকাশ পাওয়া একটি পেপার দাবি করছে, হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন ওষুধ, ক্লোরোকুইনের একটি কম বিষাক্ত ডেরাইভেটিভ, কোভিড-১৯ এর সংক্রমণকে বাধা দিতে কার্যকর। চীনের হাসপাতালগুলো এই ওষুধটি ব্যবহার করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। প্রাথমিক ক্লিনিকাল তথ্যের আলোকে ন্যাশনাল হেলথ কমিশন অব দ্য পিপলস রিপাবলিক অব চায়না কোভিড-১৯ এর সংক্রামণ চিকিৎসায় পরীক্ষামূলক ওষুধের তালিকাতে ক্লোরোকুইনকে এরই মধ্যে যুক্ত করা করেছে। হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন এবং ক্লোরোকুইন, সাধারণত বাতজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ওষুধগুলোর উপাদান পেরুভিয়ান সিনচোচা গাছের ছাল থেকে প্রাপ্ত। ক্লোরোকুইন দীর্ঘদিন ধরে ম্যালেরিয়া এবং অ্যামিবিয়াসিসের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

 

"