কক্সবাজারে ৮ বছর আটকে আছে মানব পাচারের ৬৩৭ মামলা

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

কক্সবাজার প্রতিনিধি

পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ডসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নানামুখী অভিযানের পরও বন্ধ হচ্ছে না মানব পাচার। ঘাট পরিবর্তনসহ নানা কৌশলে চলছে এসব অপরাধ। গত ১১ ফেব্রুয়ারি সাগরপথে মালয়েশিয়ায় যাত্রাকালে সেন্টমার্টিনে ট্রলারডুবিতে ২১ জন রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার পর প্রশাসন আরো সতর্ক হলেও রয়েছে এর বিপরীত চিত্র। জানা গেছে, কক্সবাজারে মানব পাচার আইনে এখন পর্যন্ত ৬৩৭টি মামলা হলেও বিচার হয়নি একটিরও। বিচারক সঙ্কট ও সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে আটকে আছে মানব পাচার মামলাগুলো। মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে মানব পাচারের শিকার লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত ও বিচার বঞ্চিত হচ্ছে।

আইন কর্মকর্তার দাবি, এসব মামলায় সাক্ষী পাওয়া কঠিন। তাই সহজে বিচার কাজ শেষ করাও কঠিন। তবে শুধু মামলা নয়, দালাল নিয়ন্ত্রণ ও মানব পাচার রোধে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। পুলিশ বলছে, এরই মধ্যে দালালদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এদের ধরতে অভিযান চলছে। সাগরপথে মালয়েশিয়ার মানব পাচার শুরু ২০১১ সাল থেকে। বিভিন্ন সংস্থার পদক্ষেপের কারণে ২০১৪ সালের শেষ দিক থেকে অনেকটাই বন্ধ ছিল সাগরপথে মানব পাচার। কিন্তু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঘিরে ২০১৭ সালের পর আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে দালালচক্র। মানব পাচার মামলার বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা নোঙরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারের আট থানায় মানব পাচার মামলা হয়েছে ৬৩৭টি। এর মধ্যে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ৯৭টি, রামু থানায় ২৪টি, উখিয়া থানায় ৬৮টি, টেকনাফ মডেল থানায় ২১৮টি, চকরিয়া থানায় ১৯টি, কুতুবদিয়া থানায় একটি, মহেশখালী থানায় ৩৬টি এবং পেকুয়া থানায় ৮টি মামলা হয়েছে। থানার এসব মামলা ছাড়া ট্রাইব্যুনালেও অনেক মামলা রয়েছে। চলতি বছর জেলার বিভিন্ন থানায় মানব পাচার আইনে মামলা হয়েছে আরো ২৮টি। মামলাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৬৩৭ মানব পাচার মামলার একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। সাক্ষীর অভাবে মামলায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এক প্রকার থমকে আছে মামলাগুলো। এছাড়াও অধিকাংশ মামলায় আসামিদের সম্পদ ক্রোকের জন্য আদালত আদেশ দিলেও একটিও কার্যকর এ পর্যন্ত হয়নি। চলতি সালে সাগরপথে মানব পাচার আর প্রাণহানিকে ঘিরে আবারও আলোচনায় চলে আসে কক্সবাজার।

পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজার উপকূলে মানব পাচারের ঘটনা ঘটে ২৮টি। যেখানে ৭১৩ রোহিঙ্গাকে উদ্ধারের পাশাপাশি গ্রেফতার করা হয় ৬৯ জনকে।

নোঙরের প্রধান নির্বাহী দিদারুল আলম রাশেদ বলেন, কক্সবাজারে মানব পাচারের অহরহ ঘটনা ঘটলেও মামলা হয়েছে কিছু। এর মধ্যে একটি মামলারও সুরাহা হয়নি। এটা কোনোভাবে কাম্য নয়। যারা দুঃসাহস দেখিয়ে মামলা করার জন্য এগিয়ে এসেছে, তাদের সমাধান দিতে না পারাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটার সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা উল্টো আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে।

তিনি আরো বলেন, মানব পাচার আইন অনুযায়ী এই মামলার ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগ গঠন এবং ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলো, গত আট বছরে একটি মামলারও বিচারকাজ শেষ হয়নি। ফলে মানব পাচার প্রতিরোধে প্রণীত আইনের কোনো সুফল পাচ্ছে না ভিকটিমরা। পাচারও রোধ করা যাচ্ছে না।

কক্সবাজার আদালতের সিনিয়র আইনজীবী সরওয়ার কামাল জানান, কক্সবাজারের মানব পাচার মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ার পেছনে একমাত্র কারণ সাক্ষী ও বাদীদের আদালতে হাজির না হওয়া। সাক্ষী হাজির না হওয়ার কারণে মানব পাচার মামলায় কোনো ধরনের অগ্রগতি নেই। মামলায় স্থবিরতা ও শাস্তি না হওয়ার কারণে মানব পাচারকারীরা আরো সুযোগ নিচ্ছে। সুযোগ পেলেই জড়িয়ে যাচ্ছে ফের মানব পাচারে। এ কারণে কক্সবাজার অঞ্চলে মানব পাচার বন্ধ হচ্ছে না।

মানব পাচারের শিকার সুমন বড়–য়া (৩২), বদিউল আলমসহ (৫২) বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালত বা থানা থেকে কোনো ধরনের নোটিশ দেওয়া হয় না। মাঝে মধ্যে আদালতে মামলার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গেলে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), পেশকার ও দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানিয়ে দেন, মানব পাচার মামলাগুলোর বাদী সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে এসব মামলা পরিচালনা হচ্ছে। তাই সাক্ষীদের আদালতে যাওয়ার দরকার নেই। পুলিশের পক্ষ থেকেও কিছু জানানো হয় না। এই সুযোগে মানব পাচারকারীরা জামিনে বের হয়ে এসে সাক্ষীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে বলে অভিযোগ।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম জানান, ২০১১ সাল থেকে কক্সাবাজারে মানব পাচার আইনে ৬৩৭টি মামলা হলেও তার একটির বিচারকাজও শেষ হয়নি। মামলাগুলোর কিছু কিছু চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়েছে। তবে মামলাগুলোর সাক্ষী পাওয়া নিয়ে একটু কঠিন। তবু রাষ্ট্রপক্ষ চেষ্টা চালাচ্ছে এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে।

কক্সবাজার জেলা আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট অরুপ বড়ুয়া অপু বলেন, ভিকটিম এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সঠিক সময়ে সাক্ষ্য দিতে আসেন না। অনেক ভিকটিম খবরও নেন না। সাক্ষীরা যদি সঠিকভাবে আদালতে এসে সাক্ষ্য দেন তাহলে মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি করা কোনো ব্যাপার না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলার বিচার না হওয়ার পাশাপাশি মানব পাচার প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে নেওয়া নানা উদ্যোগও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে আবারও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে দালালচক্র।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন (বিপিএমবার) বলেন, মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত দালালচক্র শনাক্ত হয়েছে। এখন চেষ্টা চলছে তাদের ধরার। এমনকি বিকাশের মাধ্যমে মানব পাচারের টাকা লেনদেনকারীও শনাক্ত হয়েছে। আমরা অচিরেই সবাইকে আইনের আওতায় আনতে পারব।

প্রসঙ্গত, সাগরপথে অনিশ্চিত স্বপ্নযাত্রায় সর্বশেষ গত ১১ ফেব্রুয়ারি সেন্টমার্টিনের কাছে ট্রলারডুবে মারা যায় অন্তত ২১ রোহিঙ্গা। এ ঘটনায় দালাল ও মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলাও হয়েছে।

 

"