ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা

নিয়ম অমান্য, কর্মকর্তারা অফিস করেন ইচ্ছামতো

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

ইচ্ছামতো সময়ে অফিস আসা-যাওয়া করেন কর্মকর্তারা। সকাল সাড়ে ১০টার আগে আসেন না কর্মকর্তাদের কেউই। কর্মচারীরাও বসদের মতো বেলা গড়িয়েই অফিসে আসেন হেলে-দুলে। অনেকে আবার অফিসে আসনেই না। এভাবেই সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে ইচ্ছামতো অফিস করেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনেকেই। এই চিত্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার।

সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস রোববার এবং পরদিন গত সোমবার। অফিস টাইমের ২ ঘণ্টা পরও এই দুদিন কর্মস্থলে হাজির হননি কর্মকর্তাদের কেউই। এমনকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও (ইউএনও) ছিলেন অনুপস্থিত। তবে ইউএনও পঙ্কজ বড়–য়ার দাবি, সকাল ৯টার মধ্যেই তিনি অফিসে পৌঁছেছেন। এরপর অন্য কাজে বেরিয়ে গেছেন।

সকাল ৯টায় অফিসে এসে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত আবশ্যকীয়ভাবে নিজ অফিসকক্ষে অবস্থান করতে হবে। মন্ত্রিপরিষদের এক পরিপত্রে এমন নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়, সেবা গ্রহণকারী নাগরিকদের সুবিধা এবং সরকারি কর্মকা-ে গতিশীলতা ও সমন্বয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনস্বার্থে সকাল ৯টায় সরাসরি অফিসে আসবেন এবং আবশ্যকীয়ভাবে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত অফিসে অবস্থান করে অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম স্বাক্ষরিত ওই পরিপত্র জারি করা হয়।

জেলা শহরের পশ্চিম মেড্ডা এলাকায় সদর উপজেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ছাড়াও রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিস, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দফতর, উপজেলা কৃষি অফিস, উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তার কার্যালয়, উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয়, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, উপজেলা বিআরডিবি কার্যালয়, উপজেলা আইসিটি অফিসসহ আরো বেশ কয়েকটি অফিস রয়েছে এই চত্বরে। সরকারি অফিসসূচি অনুসারে সকাল ৯টা থেকে অফিস টাইম। কিন্তু এ সময় সরকারি বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের কোনো কর্মকর্তাই অফিসে হাজির হন না এই উপজেলায়। গত দু-দিন সকাল পৌনে ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ওই উপজেলায় অবস্থান করে অফিস উপস্থিতির এই অনিয়ম চোখে পড়ে। সোমবার সকাল ৯টা ৪ মিনিটে উপজেলায় গিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের উপজেলা চত্বর ও বারান্দা ঝাড়– দিতে দেখা যায়। সাড়ে ৯টার দিকে দু-একটি অফিসে আসেন অফিস সহায়ক। ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে যুব উন্নয়ন অফিসে আসেন কয়েকজন কর্মচারী। ওই সময় ইউএনওর কার্যালয়ে আসেন একজন নারী কর্মচারী। তবে রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিভিন্ন শিক্ষা অফিসের তালা খোললেও গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত সেগুলো তালাবদ্ধই ছিল। এর আগের দিনের চিত্র, সকাল পৌনে ৯টার দিকে দুই অফিসে আসেন দুজন অফিস-সহায়ক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাদের একজন জানান, আমাদের চলে আসতে হয় সাড়ে ৮টার দিকে। অফিস গোছাতে হয়। সঠিক সময়ে না এলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ফিরে যাবেন। তবে স্যাররা খেয়ালখুশিমতো আসেন। তবে আরেক অফিস-সহায়ক জানান, স্যার তো এত দেরি করেন না। সকাল ৯টার পর আসেন অন্যান্য অফিসের অফিস সহায়করা। সকাল পৌনে ১০টার দিকে উপজেলা যুব উন্নয়নের কয়েকজন কর্মচারীকে উপজেলা চত্বরে রোদ পোহাতে দেখা যায়। কর্মস্থলে প্রথম সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হাসনাত মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ভূঞা। তবে তিনিও প্রায় ১ ঘণ্টা বিলম্বে ৯টা ৫০ মিনিটে হাজির হন। কিছুক্ষণ নিজ টেবিলে কাজ করার পর চলে যান দোতলায় উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কক্ষে। বেলা পৌনে ১১টার দিকে উপজেলা শিক্ষা অফিসার আবুল হাসান মো. রেজাউল করিমের খোঁজ করা হলে জানানো হয় তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষে মিটিং করছেন। তবে তখন পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পঙ্কজ বড়–য়া অফিসেই আসেননি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার খোঁজ নেওয়া হলে বলা হয় তিনি জেলায় রয়েছেন। উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রামার ইঞ্জিনিয়ার মো. দেলোয়ার হোসেন অফিসে নিয়মিত আসেন না। তিনি ডরমেটরিতেই অবস্থান করেন। সেখানে বসেই চালান অফিসের কাজকর্ম। তার অধীনস্থ কোনো লোকবল না থাকায় তিনি সেখানেই অফিসের কাজ করেন বলে জানা যায়। ইচ্ছেমতো অফিসে আসা-যাওয়া করেন তিনি। কেউ জরুরি কাজ নিয়ে এলে তাকে ডরমেটরিতে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়। উপজেলা সার্ভার রুমে চার মাস আগে এশিয়া ব্যাংকের বুথ খোলা হয়। গত রোববার সকাল সোয়া ১০টার দিকে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. সামছু উদ্দিন রিকশাযোগে অফিসে এসে পৌঁছান। তড়িগড়ি করে তার অধীনস্থ অফিস-সহায়কের কাছ থেকে টাকা নিয়ে রিকশার ভাড়া পরিশোধ করেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের উপজেলা প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম অফিসে আসেন সোয়া ১০টায়। অফিসে এসে অন্যদের সঙ্গে খোশগল্পে মত্ত হয়ে পড়েন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুনশি তোফায়েল হোসেন অফিসে আসেন ১০টা ১৮ মিনিটে। তবে ব্যতিক্রম ছিলেন যুব উন্নয়নের ক্রেডিট অফিসার আবুল ফজল। ঠিক ৯টায় উপস্থিত হন অফিসে। বেলা ১১টায়ও অফিসে দেখা পাওয়া যায়নি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জীবন ভট্টাচার্য্যরে। তার দফতরের এক কর্মচারী জানান, স্যার রাস্তায় আছেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পঙ্কজ বড়–য়ার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি জানান, সকাল ৯টার মধ্যেই অফিসে ঢুকেন তিনি। গতকালও ৯টা ৫ মিনিটে এসে কয়েকটি রেজুলেশনে স্বাক্ষর করে বেরিয়ে গেছেন। অন্য কর্মকর্তাদের বিষয়ে বলেন, সবাই কাজে দৌড়াচ্ছে। অফিস হাজিরার বিষয়ে বলেন, স্ব-স্ব ডিপার্টমেন্ট তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে হাজিরা দেন। তবে আমার এখানে ডিজিটাল ও খাতায় স্বাক্ষরে দুই পদ্ধতিতেই হাজিরা হয়।

 

"