জীবন কাটল মানুষের সেবায় আমার খবর কেউ নেয় না

রানার লাবিবুদ্দিনের আক্ষেপ

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০

সফিকুল আলম সবুজ, কাপাসিয়া (গাজীপুর)

কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার অপর নাম জীবন। বৃদ্ধা প্রতিবন্ধী লাবিবুদ্দিনের (৬৫) জীবনও তেমনই এক জীবনের দৃষ্টান্ত। শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও জীবনযুদ্ধে থেমে থাকেননি তিনি। জীবনযুদ্ধে অনবরত লড়াই করে চলেছেন লাবিবুদ্দিন। ছোটবেলা থেকে শুরু করে জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও তার স্বস্তির নিশ^াস নেওয়ার ভাগ্যে জোটেনি। রানার লাবিবুদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, সারা জীবন রাষ্ট্র ও মানুষের সেবা করলাম। মানুষের সুখ-দুঃখের খবর বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিলাম। এখন আমি অসহায় আমার খবর তো কেউ নেয় না।

প্রতিবন্ধী ও দরিদ্র হওয়ায় তার কোনো ভালো বন্ধুও নেই। দুর্বিষহ ও মানবেতর জীবনযাপন কাটাচ্ছেন ডাকপিয়ন প্রতিবন্ধী লাবিবুদ্দিন। তিনি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার চরখামের গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের দরিদ্র পরিবারের সন্তান। জন্মের তিন বছর পর তিনি টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ইকুরিয়া উচ্চবিদ্যালয় হতে মানবিক বিভাগ নিয়ে সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে ম্যাট্রিক পাস করেছেন। অভাবের সংসারের হাল ধরতে একটি চাকরি সন্ধানে ঘুরেছেন অনেক। কোথাও চাকরি না পেয়ে শেষে স্থানীয় ছামাদ মোল্লার মাধ্যমে পোস্ট অফিসের ডাকপিয়ন পদে ৬০০ টাকা সম্মানী ভাতা মাসিক বেতনে চাকরি পান। এই উপার্জনের টাকা দিয়ে তিনি সংসারের হাল ধরেছেন।

লাবিবুদ্দিনের দুই মেয়ে এক ছেলে রয়েছে। মেয়ে দুজনকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে জায়েদ এ বছর কারিগরি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। প্রতিবন্ধী লাবিবুদ্দিন দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে রাষ্ট্রের কাজ করে যাচ্ছেন সামান্য সম্মানী ভাতার বিনিময়ে। এখন তার সম্মানী ভাতা বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার টাকা। স্থানীয় ইউপি মেম্বার লাবিবুদ্দিনকে একটি বয়স্কভাতা কার্ড করে দিয়েছেন তা থেকে সামান্য কিছু টাকা পান তিনি। এই টাকা দিয়ে তার সংসার চালাতে হয়। বয়সের বাড়ে এখন তিনি নুয়ে পড়েছেন। তার পরও প্রতিদিন নিজ বাড়ি চরখামের থেকে পাঁচ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কাপাসিয়া সদর পোস্ট অফিসে এসে এখান থেকে ডাক নিয়ে চার কিলোমিটার পথ চলে ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিস রাওনাট বাজারে নিয়ে যান। সেখান থেকে আবার ডাক নিয়ে ছুটে চলেন সদর পোস্ট অফিসে। রানার প্রতিবন্ধী লাবিবুদ্দিন এভাবে দুই যুগের অধিক সময় কাটিয়েছেন রাষ্ট্রের কাজে, মানুষের সুখ-দুঃখের খবর পৌঁছে দিয়ে। কিন্তু অভাব আজও তার পিছু ছাড়েনি। প্রতি বছর দুটি ইউনিফর্ম একটি ছাতা ও সামান্য সম্মানী ভাতা ছাড়া তার ভাগ্যে আর কিছু জুটেনি। লাবিবুদ্দিন ও তার পারিবারিক সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

কাপাসিয়া পোস্ট মাস্টার ইব্রাহিম খলিল জানান, লাবিবুদ্দিন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও দীর্ঘদিন ধরে ডাক পিয়ন পদে কাজ করে যাচ্ছেন। এ কাজে যে সম্মানী ভাতা পান তা দিয়ে সংসার খরচ চলে না।

ইডি কর্মচারী ইউনিয়ন গাজীপুর জেলা সভাপতি দীরেন বাবু জানান, ব্রিটিশ আইনে ১০ টাকা সম্মানী ভাতা ভিত্তিতে ডাকপিয়ন পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা এখনো অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরি করছেন লাবিবুদ্দিন। সারা দেশে এই সংখ্যা প্রায় ২৩ হাজার ৫০০ জন। আমাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে যাচ্ছি। সরকার আন্তরিক হলে আমাদের সুদিন আসবে।

 

 

"