জ্ঞানের মশাল ‘অনির্বাণ লাইব্রেরি’

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

আসাফুর রহমান কাজল, খুলনা (মহানগর)

‘এত বই আমাদের কারো বাড়িতে নেই, কম্পিউটারেও নেই। প্রতিদিন এখানে এসে বই পড়ি। কম্পিউটার শিখি, নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তি, বিতর্কও শিখি এবং প্রাইভেট পড়ি। সবই বিনা টাকায়। টাকা দিয়ে এসব করতে গেলে এলাকার মানুষের পড়ালেখা হতো না। এলাকার মানুষ তো গরিব। তবে এখন আমাদের এ এলাকার অনেক ছাত্রছাত্রী বাইরে পড়াশোনা করে। এখানে বাল্যবিয়ে, ইফটিজিং, মাদক, জঙ্গিবাদ এবং মানুষ ও সমাজের জন্য উপকারী সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে নিয়েও ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের সচেতন করা হয়। এ কথাগুলো শিক্ষার্থী বৃষ্টি ঘোষ, রুপম ভদ্র, তন্নি মন্ডল, আকাশ দত্ত, সমাপ্তি দেবনাথ, তাজমিন নাহার এবং স্বাধীন ভদ্রের।

খুলনা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রাম পাইকগাছা উপজেলার মামুদকাটী। হরিঢালী ইউনিয়নের এই গ্রামে প্রতিষ্ঠিত অনির্বাণ লাইব্রেরি যেন এলাকার মানুষের জ্ঞানের মশাল। হিন্দুপ্রধান এ গ্রামে বা এর আশপাশের কয়েকটি গ্রামে একসময় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। বাল্যবিয়ে, মাদকসহ নানা কুসংস্কারে ভরা ছিল এখানকার মানুষ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনও ছিল আঁধারে। ১৯৯০ সালে এ এলাকার সোনাতনকাটী গ্রামের জয়দেব ভদ্র, মানিক ভদ্র, মামুদকাটীর বিশ্বকর্মা মন্ডল ও হরিঢালীর মৃণাল ঘোষের চিন্তায় আসে গ্রামকে আলোকিত করতে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করার। ১০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হয়। নাম দেওয়া হয় অনির্বাণ লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরি আর ১০টা লাইব্রেরির মতো নয়। এটি যেন এলাকার মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এখন বদলে যেতে শুরু করেছে এলাকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট।

প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গণেশ ভট্টাচার্য জানান, আমরা গরিব শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দিচ্ছি। ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করছি। এখানে ছেলেমেয়েদেরকে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়, ভালো মানুষ হওয়ার পথ দেখানো হয়। অনির্বাণ লাইব্রেরি এখন অত্র এলাকার পরশপাথর। এর সংস্পর্শে আসলে আলোকিত হওয়া যায়। এই অজোপাড়াগায়ের মানুষ এখন এখানে বসেই বিনামূল্যে পায় ইন্টারনেট সেবা। এলাকার শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও লাইব্রেরি থেকে সেবা পান।

প্রতিষ্ঠানটির মহিলা সম্পাদিকা সন্ধ্যা রানী হালদার জানান, বর্তমানে এখানে প্রায় ৭ হাজার বই রয়েছে এবং প্রতিদিনই বই বাড়ছে। এখানে বাদ্যযন্ত্র, সংগীত, নৃত্য, অভিনয়, গীতিনাট্যসহ সমসাময়িক বিষয়াদি নিয়ে এলাকার শিশু, নারী-পুরুষদের সচেতন করা হয়।

মাহমুদকাটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নীলিমা রানী ঢালী জানান, স্কুল ছুটি হয়ে গেলে ছেলেমেয়েরা ছুটে যায় ওই লাইব্রেরিতে। সেখানে প্রতিদিনকার পত্রিকা, বই, কম্পিউটার, নাচ, গান করার সুযোগ রয়েছে। টাকা ছাড়া কোচিং করতে পারে, পড়ালেখায় ভালো করলে বৃত্তি দেওয়া হয়। এই লাইব্রেরিটি এখন এই গ্রামের একটি বড় পরিচয় বহন করে। অনির্বাণের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হচ্ছে পুরো এলাকা। জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠের সিনিয়র সাংবাদিক নিখিল চন্দ্র ভদ্র জানান, যখন লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। গ্রামের মানুষের সাধারণত লক্ষ্য থাকে ছোটখাটো চাকরি করা। কিন্তু ওই লাইব্রেরির বিভিন্ন কার্যক্রম আমাদের মনের দরজা খুলে দিয়েছে। উচ্চশিক্ষা বা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আকাক্সক্ষা জাগিয়ে তুলছে। লাইব্রেরির সভাপতি সমীরণ দে জানান, লাইব্রেরি পরিচিতি এখন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আশপাশের অনেক এলাকা থেকে এখানে মানুষ আসছে। কিন্তু লাইব্রেরিতে যাতায়াতের রাস্তাটির বেহাল দশা। এটি সংস্কারের জন্য আমরা কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

"