নেতাদের পদত্যাগে বিএনপিতে অস্বস্তি

প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

বদরুল আলম মজুমদার

বিএনপির সিনিয়র দুই নেতা পদত্যাগ করেছেন। দলের ভেতরে গুঞ্জন আছে আরো বেশ কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই তালিকায় যাদের নাম আসছে তারা অনেকেই দলটির প্রতিষ্ঠার সময় থেকে রাজনীতি করে আসছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন জেলে থাকা অবস্থায়, দলের দুঃসময়ে এসব নেতাদের পদত্যাগের ঘটনাকে ভালোভাবে নিতে পারছেন না দলের অন্য নেতারা। তারা মনে করছেন, মান অভিমান যা-ই থাকুক এ নিয়ে নেতারা দলীয় ফোরামে কথা বলতে পারেন। আবার দলের বর্তমান নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত কাঠামোর ওপর ক্ষুব্ধ নেতারা মত দিচ্ছেন, আরো আগেই ক্ষুব্ধ নেতাদের পদত্যাগ করা উচিত ছিল। তারা উদাহরণ টেনে বলেন, সম্প্রতি সিলেটে যুবদলের কমিটি নিয়ে কেন্দ্রীয় চার নেতা পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, দলীয় নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্ন রেখেই তারা পদত্যাগের সিদ্ধান্তে অনড় আছেন। যদিও দলের পক্ষ থেকে সিলেটের নেতাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি। তারা মনে করছেন সিলেটের মতো অবস্থা দেশের অনেক জায়গাতেই আছে। তবে শুধু সিনিয়র নেতা নন, তৃণমূলেও দলের নিবেদিত শত শত নেতাকর্মী নিজেদের দল থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। সামনে সেই সংখ্যা আরো বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। দলীয় সূত্র জানায়, লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের আশপাশে থাকা সুবিধাভোগীদের সুপারিশে যখন-তখন সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে যাতে সায় নেই দলের নীতি নির্ধারণী সিনিয়র নেতাদের। সিলেট, বগুড়া ও ফেনীসহ দেশের অনেক সাংগঠনিক জেলা ও থানায় এমন সব লোকদের নেতা বানানো হয়েছে যাদের গ্রহণযোগ্যাতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অবাক করার বিষয় হচ্ছে সিনিয়র নেতাদের নিজ নিজ এলাকায় যেসব কমিটি দেওয়া হয় তাতেও তাদের মত জানতে চাওয়া হয় না। এতে অনেক নেতা তারেক রহমানের কড়া সমালোচনায় মুখর হচ্ছেন। তাই বিএনপির আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন নেতারা নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার পথে হাঁটছেন। সূত্র আরো জানায়, গত সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়েও তারেকের পাশে থাকা সিন্ডিকেট নমিনেশন বাণিজ্য করে হাজার কোটি টাকা আদায় করেছেন। এছাড়া গত ১০ বছর থেকে চলা দলীয় পুনর্গঠনকে পুঁজি করে পদ বাণিজ্য দলটিতে এখন ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় আত্মসম্মান বজায় রেখে দলের আরো অন্তত ডজনখানেক নেতা পদত্যাগ করতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। জানা যায়, বিগত কয়েক বছরে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, মোসাদ্দেক আলী ফালু, ইনাম আহমেদ চৌধুরীর পর গত মঙ্গলবার বিএনপি ছাড়েন আরেক ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খান। মাহবুবুর রহমানের পদত্যাগের মধ্যদিয়ে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের কেউ প্রথমবারের মতো দল ছাড়লেন। মাহবুবুর রহমান দলের সব ধরনের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বরাবর লেখা চিঠি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। যদিও তার স্ত্রীর পক্ষ থেকে পদত্যাগের বিষয়টি গুঞ্জন হিসেবেই আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

দুই দিনে দুই জ্যেষ্ঠ নেতার পদত্যাগের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন চলছে যে আরো অন্তত পাঁচ থেকে সাত নেতা বিএনপি ছাড়ছেন। এদের মধ্যে আছেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী। এছাড়া আরেক ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান দলে স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ না পেয়ে হাইকমান্ডের ওপর ক্ষুব্ধ আছেন। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে জায়গা না হলে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। বিএনপি পোড় খাওয়া নেতাদের একজন আবদুল্লাহ আল নোমান। চট্টগ্রাম বিএনপির সবচেয়ে সিনিয়র নেতা হওয়া সত্ত্বেও তাকে স্থায়ী কমিটিতে জায়গা দেয়া হয়নি। দুই দুবার কাউন্সিলে চট্টগ্রাম থেকে দুই নেতাকে (সালাহউদ্দিন কাদের ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী) স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে যারা একসময় অন্য দল করতেন। তারা রাজনীতিতেও নোমানের জুনিয়র। এ কারণে নোমান ক্ষুব্ধ।

সবশেষ বিএনপির স্থায়ী কমিটির শূন্য পদে জায়গা হয়েছে সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান টুকুর। স্থায়ী কমিটিতে উল্লিখিত নেতাদের নাম বহু দিন ধরেই ঘুরেফিরে আসছিল। কিন্তু তাদের সেই মূল্যায়ন এখনো করা হয়নি। এ কারণে তারা দলের হাইকমান্ডের ওপর ক্ষুব্ধ। দলীয় সূত্রে আরো জানা যায়, অবমূল্যায়নের কারণে চট্টগ্রামের আরো একজন নেতা ও বরিশালের এক নেতাও পদত্যাগ করতে পারেন। তারা দুজনই বিএনপির কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতা। তবে পদত্যাগের বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে এসব নেতা বলেন, এটা গুঞ্জনই। এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে দল পরিচালনায় স্থায়ী কমিটির নেতা ছাড়া ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাও হয় না। যদিও স্থায়ী কমিটির পর ভাইস চেয়ারম্যানরাই বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ। বিএনপির দুই ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়ে বলেন, দলের কোনো সিদ্ধান্তই জানতে পারি না। প্রতিদিন শুনতে পাই নয়াপল্টনে স্কাইপে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে ডেকে ডেকে কথা বলেন। কী বলেন, কী সিদ্ধান্ত নেন তাও জানি না। দলে আছি কী নেই তাও জানি না। এ বিষয়ে আলতাফ হোসেন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, আরো অনেক সাংবাদিক আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। এর পর আমি নিজে থেকে অনেক নেতার সঙ্গে কথা বলেছি। সবাই বলেছে ‘এটি ভুয়া খবর।’ দলের মধ্যে যে ক্ষোভ বিরাজ করছে তা কীভাবে দূর করা সম্ভব জানতে চাইলে তিনি বলেন, ক্ষোভ দূর করা সম্ভব নয়; ক্ষোভের কারণ দূর করতে হবে।

সম্প্রতি এক মামলায় হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তিনি আদালত থেকে জামিনেও মুক্ত হন। এরপর এক অনুষ্ঠানে তিনি অভিযোগ করেন, রিজভী ছাড়া কেউ তার অথবা তার পরিবারের খোঁজ নেননি। দলের নেতাদের সহমর্মিতাবোধ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এ বিষয়ে বলেন, দলে সব সময় সব কিছু আমার অনুকূলে থাকবে এটি ভাবা ঠিক নয়। প্রতিকূল অবস্থাও আসবে। এটি মোকাবিলা করাই রাজনীতি। যারা পদত্যাগ করছেন, তা ব্যক্তিগত স্বার্থে। এখানে আদর্শের কোনো বিষয় নয়। যেমন আমি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিরুদ্ধে ছিলাম। দল তখন আমার কথা শোনেনি, একসময় তো আমার কথা শুনতে পারে। ক্ষোভ প্রকাশ করে পদত্যাগ কোনো সমাধান নয়।

এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির যৌথ নেতৃত্বে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। এখানে তারেক রহমান এককভাবে সিদ্ধান্ত নেননি। সেখানে কেউ যদি তার ওপর অহেতুক দোষ চাপান তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

"