রূপনগরে বিস্ফোরণ

আহতরা হাসপাতালে এখনো কাতরাচ্ছেন

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

একটু পর পর ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠছেন বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদ। তাকে দেওয়া হচ্ছে ব্যথানাশক ইনজেকশন। পাশেই চোখ মুছছেন সাঈদের স্ত্রী। গত ৩০ অক্টোবর বিকালে রাজধানীর রূপনগরের শিয়ালবাড়ী বস্তির পাশে তারই গ্যাসবেলুনের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে সাত শিশুর মৃত্যু হয়, আহত হন অন্তত ২০ জন। সেদিন থেকেই হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন আহত সাঈদ। বিস্ফোরণের ঘটনায় রূপনগর থানায় যে মামলা হয়েছে, তার একমাত্র আসামি এই বেলুন বিক্রেতা, বিস্ফোরকদ্রব্য আইন বা গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহারবিধি নিয়ে যার কোনো ধারণাই নেই। ওই ওয়ার্ডে দায়িত্বরত পুলিশ কনস্টেবল মনোয়ার হোসেন বলেন, উনার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো, তবে এক হাতে সমস্যা আছে। আপাতত তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। একই ওয়ার্ডের ১২ নম্বর বেডে শুয়ে ব্যথায় কাঁদছেন রিকশাচালক জুয়েল সরদার (২৯)। সেদিন বাচ্চার জন্য বেলুন কিনতে গিয়ে বিস্ফোরণে তার বাঁ হাত ভেঙে যায়।

গত মঙ্গলবার ওই হাতে অস্ত্রোপচার করেছেন চিকিৎসকরা। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জুয়েল বলেন, আমি বাচ্চার জন্য বেলুন কিনতে গেলাম, তারপর বেলুনওয়ালা বললেন, তার কাছে গ্যাস নেই। বলেই সে তার সিলিন্ডারে ছাইয়ের মতো কি জানি একটা দিলেন। আমিও দাঁড়ায়ে দেখতে লাগলাম, তারপর হঠাৎ বিস্ফোরণ হলো। এই কষ্টের মধ্যেও সান্ত¡না খুঁজে তিনি বলেন, ভাগ্যিস আমার বাচ্চাগুলা আমার সঙ্গে ছিল না। নিজের কষ্ট সহ্য করতে পারছি, কিন্তু ওদের কিছু হলে বাঁচতাম না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিল্ডিংয়ের পাশেই বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৫ বছর বয়সি জান্নাত বেগম। পেশায় গৃহকর্মী এই নারী সেদিন বিস্ফোরণে হারিয়েছেন তার ডান হাত।

তার স্বামী রিকশাচালক মো. নজরুল বলেন, সেদিন বিকালে জান্নাত বাজার করতে যাচ্ছিলেন। পাশেই ঘটনাটি ঘটে। বিস্ফোরণে ওই জায়গাতেই তার ডান হাত শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। এখানে চিকিৎসা চলছে। মঙ্গলবার বিকালে ইমার্জেন্সি থেকে এখানে (বার্ন ইউনিট) ট্রান্সফার করেছে। অপারেশন লাগবে কিনা ডাক্তার কিছু বলেননি; তবে রোজ এসে দেখে যান। ওষুধ আর ইনজেকশন দিচ্ছেন প্রতিদিন।

বিস্ফোরণে এক চোখ হারানো ছয় বছরেরর মো. মোস্তাকিনের চিকিৎসা চলছে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে। রূপনগরের ৯ নম্বর রোড মডেল স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ত সে। মোস্তাকিনের বাবা মফিজুরের রহমান কাজ করেন একটি প্লাস্টিক কারখানায়। তিনি টেলিফোনে জানান, তার ছেলের ডান চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ডান পা ভেঙে গেছে, পুড়ে গেছে শরীরের অনেকটা অংশ। শনিবার অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা।

রূপনগরের মাদরাসা ছাত্র ৮ বছর বয়সি জনি সেই বিস্ফোরণে দুই চোখই হারিয়েছে। তার চিকিৎসা চলছে শ্যামলীর চক্ষু হাসপাতালে। তার বাবা রিকশা গ্যারেজের শ্রমিক মো. সুলতান জানান, জনির মুখের অনেকটা অংশ পুড়েও গেছে। তিন দিন সে অচেতন ছিল।

মন্ত্রণালয়ের চার সুপারিশ : রূপনগর বিস্ফোরণের পর এ ধরনের দুর্ঘটনারোধে সরকারের কাছে চার দফা সুপারিশ করেছে বিস্ফোরক পরিদফতর। পরিদফতরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. সামসুল আলম বলেন, ওই ঘটনা তদন্ত করে বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। হাইড্রোজেন ভর্তি বেলুন নিষিদ্ধেও সুপারিশ করেছি আমরা।

এ কর্মকর্তা জানান, বেলুনের জন্য কস্টিক সোডা ও অ্যালুমিনিয়াম পাউডার দিয়ে হাইড্রোজন গ্যাসের রিঅ্যাক্টর বানায় এক শ্রেণির হকার। এ ধরনের একটি সিলিন্ডারই রূপনগরে বিস্ফোরিত হয়েছে। পরিদফতরের পক্ষ থেকে সুপারিশের মধ্যে রয়েছে শিশু-কিশোরদের জন্য হাইড্রোজেন বেলুন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অভিভাবকদের সতর্ক করতে হবে। হাইড্রোজেন বেলুন বিক্রেতাদের পেলেই থানায় সোপর্দ করতে হবে। হাইড্রোজেন বেলুন নিষিদ্ধ করা যায় কিনা- সেটাও দেখার সুপারিশ করেছে পরিদফতর।

"