নেতৃত্ব সংকটে জাবি ছাত্রলীগ

সম্পাদক লাপাত্তা, চাপে সভাপতি

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

তহিদুল ইসলাম, জাবি

কমিটির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে প্রায় দুই বছর হলো। ক্ষোভ, হতাশা আর রাজনৈতিক কোন্দলে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন অনেক শীর্ষ নেতা। তা ছাড়া নিজেদের মধ্যে নিত্যনৈমিত্তিক মারামারি তো রয়েছেই। তার মধ্যেই উঠেছে ‘উপাচার্যের কাছ থেকে উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা নেওয়ার’ মতো গুরুতর অভিযোগ। সংগঠনের এই সংকটময় অবস্থায় লাপাত্তা সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া অন্য সিনিয়র নেতারাও রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয়। এমন অবস্থায় নেতৃত্ব সংকট প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগে।

জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের মো. জুয়েল রানাকে সভাপতি এবং নৃবিজ্ঞান বিভাগের এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চলকে সাধারণ সম্পাদক করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রলীগের দুই সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। পরের বছরের ২৮ এপ্রিল ২১৪ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হয়। এক বছর মেয়াদি সেই কমিটি এরই মধ্যে পার করেছে দুই বছর ১০ মাস।

কমিটির মেয়াদ অনেক আগে শেষ হওয়ায় সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশই রাজনীতি থেকে দূরে আছেন। হঠাৎ করেই লাপাত্তা সাধারণ সম্পাদক। আর ‘আর্থিক কেলেঙ্কারির’ অভিযোগে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন সভাপতি।

জানা যায়, জাবি ছাত্রলীগের ৪৪ জন সহসভাপতির মধ্যে ২২ জনের কেউ কেউ ক্যাম্পাস ছেড়েছেন, কেউ বিবাহিত ও কেউবা চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। পদ পাওয়ার পর থেকে ১নং সহসভাপতি মিনহাজুল আবেদীন মিনহাজকে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। আর ভিসির কাছ থেকে ‘কোটি টাকা ঈদ সালামি’ পেয়েছেন এমন স্বীকারোক্তির পর চাপের মুখে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন ১নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সাদ্দাম হোসেন। এ ছাড়া ৯ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে চাকরিজীবী দুজনসহ পাঁচজন ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। আর ৯ জন সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে পাঁচজন চাকরিজীবী ও বিবাহিত। সভাপতি-সম্পাদকের বাইরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রচার সম্পাদক ও দফতর সম্পাদকের দুজনই ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য অন্তত ১১ সম্পাদক পদধারী নেতার কেউ চাকরিজীবী, কেউ বিবাহিত ও কেউ ক্যাম্পাস ছাড়া।

এদিকে গত আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম ছাত্রলীগকে ২ কোটি টাকা দিয়েছেন’ বলে অভিযোগ উঠে। এ নিয়ে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়। এমন সময়ই ক্যাম্পাস থেকে সটকে পড়েন আবু সুফিয়ান চঞ্চল। এরপর উপাচার্যের কাছ থেকে ‘ঈদ সালামির নামে কোটি টাকা’ পাওয়ার কথা স্বীকার করে ছাত্রলীগের একটি অংশ। এতে ইমেজ সংকটে পড়ে ছাত্রলীগ।

শাখা ছাত্রলীগের একাধিক সূত্র বলছে, আগস্টের শেষ দিকে আবু সুফিয়ান চঞ্চল ক্যাম্পাস ছাড়েন। তার ক্যাম্পাস ছাড়ার খবর তেমন কেউ জানতেনও না। এর আগেও তিনি বহুবার ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। তবে এবার আর তার ক্যাম্পাসে ফেরার সম্ভাবনা নেই। আর সাধারণ সম্পাদক ক্যাম্পাস ছাড়ায় চাপে পড়েছেন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি।

একাধিক ছাত্রলীগ নেতা বলেছেন, চঞ্চল ক্যাম্পাসে না থাকায় কমিটি ভাঙার আতঙ্কে ভুগছেন জুয়েল রানা। তা ছাড়া ছাত্রলীগের নতুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক নেই। গত মাসে ‘টাকা পাওয়ার স্বীকারোক্তি’ নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে জুয়েল রানার দ্বন্দ্ব চরমে উঠে। সেই রেশ চলছে এখনো। এজন্য নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে রীতি অনুযায়ী শুভেচ্ছা জানাতেও যাননি তিনি।

শাখা ছাত্রলীগের একাধিক নেতা অভিযোগ করে বলেন, চঞ্চলকে সাধারণ সম্পাদক করা হলেও তিনি সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নন। ছাত্রলীগের সংকটকালীন মুহূর্তে তিনি বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতেন। সংগঠনের কর্মসূচি পালনেও তার তেমন আগ্রহ ছিল না। এ বছর শোকাবহ আগস্টের হলভিত্তিক অনুষ্ঠানের মাত্র দুটিতে উপস্থিত ছিলেন তিনি। এমনকি হলে উপস্থিত থেকেও তিনি নিজ হলে আয়োজিত কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করেননি। সম্পাদকের এমন নিষ্ক্রিয়তায় বাধ্য হয়েই সভাপতি জুয়েল রানা একক নেতৃত্বে সংগঠনের কার্যক্রম ‘কোনো রকমে’ চালিয়ে নিচ্ছেন। যদিও তাতে সংগঠনের নেতাকর্মীদের ‘ব্যাপক সাড়া’ নেই। তা ছাড়া নেতৃত্বের অদক্ষতার কারণে চঞ্চলের গ্রুপ ভেঙে আরেকটি গ্রুপ গড়ে উঠেছে। ক্যাম্পাসে যেটা বিদ্রোহী গ্রুপ নামে পরিচিত।

শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘চঞ্চল ভাই সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর প্রথম দিকে সংগঠনের কাজে সময় দিতেন। এরপর ক্রমেই দায়িত্বে চরম গাফিলতি করতে থাকেন। দেখা যেত, ছাত্রলীগের প্রোগ্রামের সময় হয়ে গেছে, সভাপতিসহ সবাই এসে বসে আছেন কিন্তু তার খোঁজ নেই। পরে তাকে হলে গিয়ে ডেকে আনতে হতো। একবার কেন্দ্রে একটা প্রোগ্রামে যোগ দেওয়ার জন্য সবাই একত্রিত হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের চার ঘণ্টা পরে তিনি আসেন। আমরা সেবার কেন্দ্র আয়োজিত প্রোগ্রামে যেতে পারিনি। এ ছাড়া তিনি সবসময় নেতাকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন। কারো খোঁজ খবর নিতেন না। তার এমন দায়িত্ব অবহেলা আর সংগঠনের প্রতি গাফিলতির কারণেই আমরা তার গ্রুপ থেকে আলাদা হয়ে গেছি।’

শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তারেক হাসান বলেন, ‘চঞ্চল ভাইয়ের সংগঠন চালানোর মতো যথেষ্ট দক্ষতা নেই। সংগঠনের প্রতি তিনি কোনরূপ দায়িত্ববোধও দেখাননি। তাকে প্রয়োজনের সময় ফোন দিয়ে পাওয়া যেত না। গত এক বছর ধরে তাকে ক্যাম্পাসে তেমন একটা দেখা যেত না। তিনি ১০ দিন হলে থাকলে ২০ দিন বাইরে থাকতেন। আর এখন তো বহুদিন হলো ক্যাম্পাসেই নেই। শুনতেছি, তিনি নাকি আর ক্যাম্পাসে আসবেন না। এভাবে তো সংগঠন চলতে পারে না।’

এসব বিষয়ে জানতে গত দুই দিনে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চলের ব্যবহৃত মুঠোফোনে অসংখ্যবার ফোন দেওয়া হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা বলেন, ‘শীর্ষ পদগুলো তো সিনিয়র নেতারা পায়। তাদের পরিবার আছে। এজন্য অনেকেই চলে গেছে। আর এমন তো না যে, সবাই একসঙ্গে চলে গেছে। একজন-দুজন করে চলে গেছে।’ সাধারণ সম্পাদকের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চঞ্চলের মা অসুস্থ। গত ৩১ আগস্ট সে বাড়ি চলে যায়। এখনো সে বাড়িতে আছে। তবে সে চলে আসবে। আর সংগঠনের কাজ তো থেমে নেই। যখন কোন মিটিং-মিছিল হয়, তখন তো সবাই আসে, সহযোগিতা করে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নেতাদের ফুল দিতে তেমন কেউ যায়নি। কেউ কেউ হয়তো ব্যক্তিগতভাবে যেতে পারে। তবে আমার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে।’

এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগে সাংগঠনিক এসব কর্মকা-ের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এ প্রতিবেদককে জানান, জাবি শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কর্মকা-ের দিকে আমাদের নজর রয়েছে। এ শাখা ছাত্রলীগের যেহেতু মেয়াদ নেই, তাই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ তাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্মেলনের নির্দেশ দিবে। তবে, কবে সম্মেলনের নির্দেশ দিকে তা এখনো ঠিক করেনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।

উপাচার্যের টাকা নেওয়াসহ অন্যান্য আর্থিক অভিযোগের বিষয়ে জয় বলেন, আমরা সম্প্রতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দায়িত্ব পেয়েছি। আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত চলছে, প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।

"