কুমিল্লায় বাড়ছে গ্যাং গ্রুপের তৎপরতা

সন্ধ্যার পর পাড়া-মহল্লা বিপণিবিতান ফ্লাইওভারে আড্ডা

প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

মারুফ আহমেদ, কুমিল্লা

কুমিল্লায় দিন দিন বাড়ছে কিশোর অপরাধীদের তৎপরতা। সন্ধ্যার পর নগরীর বিভিন্ন অলি-গলি, বিপণিবিতান, ব্যস্ততম সড়কের পাশে এবং নগরীর একমাত্র রেসকোর্স-শাসনগাছা ফ্লাইওভারের ওপর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা হোন্ডা রেখে দল বেঁধে আড্ডা দিচ্ছে। পাশাপাশি অস্তিত্ব জানান দিতে নগরীর ব্যস্ততম এলাকার বাসা-বাড়ি, দোকান-পাট বা বহুতল ভবনের দেয়ালে সংগঠনের নাম লিখে। এদের অনেকেই মাদক সেবনেও জড়িয়ে পড়ছে।

সারা দেশের মতো কুমিল্লায় গ্যাং কালচারের শুরু এ শতাব্দীর শুরুতে। এরপর একে একে নগরীর জিলা স্কুল রোড, ভিক্টোরিয়া কলেজ রোড, মোগলটুলী, বাদুরতলা, নজরুল এভিনিউ, রাজগঞ্জ, তালপুকুরপাড়, ঠাকুরপাড়া, ঝাউতলা, বাগিচাগাঁও এলাকায় বাড়তে থাকে গ্যাং গ্রুপের পৃথক পৃথক নাম পরিচয়। বর্তমানে নগরীতে কমপক্ষে দুই ডজনের বেশি গ্যাং গ্রুপ রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সিআর সেভেন, ব্লাক ড্রাগন, রেক্স, ভিল্লা গ্রুপ, ঈগল গ্যাং, ঈগল, আরজিএস, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ, ডি-ডব্লিউ, একশন টাইম, নাইট ডেভিলস, সিজেএম-২, এসকে, আর-৭, রেঞ্জারস, বিজলি, ব্ল্যাক শেডো, কেএনএক্সটি, রিয়াদ রেক্স প্রমুখ। এসব গ্রুপের কিশোর-তরুণরা প্রতিনিয়ত দল বেঁধে আড্ডা দিচ্ছে নগরীর প্রতিটি ব্যস্ততম এলাকায়। এ ছাড়াও গ্যাং কালচারের বিস্তৃতি এখন নগরীর বাইরে বিশেষ করে কোটবাড়ী, ময়নামতি সেনানিবাসের আশপাশ এলাকা, নিমসার, কংশনগর, পদুয়ারবাজার, চান্দিনাসহ বিভিন্ন স্থানে। নগরীর বাইরে থাকা এসব তরুণ-কিশোররা নগরীর বিভিন্ন গ্রুপের অনুসারী। কারো বিপদ-আপদে বা মাদক সেবনের জন্য একে অপরকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি কয়েকটি গ্রুপের অন্যতম প্রধান আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে নগরীর একমাত্র ফ্লাইওভারটি। সন্ধ্যার পর এই ফ্লাইওভারে মোটরসাইকেলসহ এসে তারা দল বেঁধে আড্ডা দিচ্ছে। পাশাপাশি তাদের উপস্থিতি জানান দিতে রং দিয়ে ফ্লাইওভারের দুই পাশের দেয়ালে লিখছে তাদের পছন্দের সংগঠনের নাম। বর্তমানে ফ্লাইওভারের দেয়ালে থাকা আরজিএস, নাইট ডেভিলস, আনলিমিটেড আড্ডা, তালপুকুরপাড় সেল-এর বহুতল ভবনের দেয়ালে অ্যাকশন টাইম, ডিবিসি, ডিকেবি, কেডি, নজরুল এভিনিউ সড়কে ব্লাক ড্রাগন, মোগলটুলী তিন রাস্তার মোড়ে ঈগল গ্যাং, ঝাউতলা, বাদুলতলাসহ অনেক স্থানে বিভিন্ন গ্রুপের নাম দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে। সন্ধ্যার পর যেখানে এসব তরুণ কিশোরদের লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করার কথা সেখানে যত্রতত্র আড্ডার মাধ্যমে তারা কতটা বিপদগামী বা অনিয়ন্ত্রিত তা সহজেই বুঝা যায়। নগরীর দেয়ালে দেয়ালে চিকা বা রং দিয়ে গ্যাং গ্রুপের নাম লিখার পাশাপাশি প্রতিপক্ষ পাল্টা রং দিয়ে মুছে দেওয়ার চেষ্টাও দেখা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জিলা স্কুল ও মডার্ন স্কুলের একাধিক শিক্ষক, অভিভাবক জানান, গ্যাং কালচারে জড়িতরা কিশোর অপরাধী সেজে হত্যা, ধর্ষণ, মাদক সেবন, পাচার, আগ্নেয়াস্ত্র বহন, হামলা, লুটপাট, ছিনতাইসহ প্রায় সব ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিটি শিশুর জন্মের তারিখ সঠিকভাবে নিবন্ধিত হলে অপকর্মে জড়িত কিশোর অপরাধীরা পার পাওয়ার সুযোগ পেত না। গ্যাং কালচারে জড়িতদের প্রধান বাহন মোটরসাইকেল। যখন তখন তাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যে দ্রুত ছুটে যাচ্ছে। কখনো সহযোগীকে প্রতিপক্ষের হামলা থেকে রক্ষা করতে, কখনোবা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, মাদক সেবন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি সবকিছুতেই এই বাহনের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। এসব হোন্ডা বা মোটরসাইকেলের কোনোটি আবার অনটেস্ট বা নম্বরবিহীন। সূত্রমতে যেখানে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মোটরসাইকেল ও অন্য কোনো যানবাহন চালনায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেখানে কীভাবে শত শত অপ্রাপ্ত বয়স্ক তরুণ-কিশোর প্রতিদিন নগরী ও নগরের বাইরে অবাধে যানবাহন চালাচ্ছে সেটাও বোধগম্য হচ্ছে না। প্রতিদিনই এসব তরুণ-কিশোরদের স্বনামধন্য বিশেষ করে গার্লস স্কুলগুলোর সামনে হোন্ডা নিয়ে অপেক্ষমাণ দেখা যায়। রয়েছে এসব তরুণদের হাতে দামি মোবাইল ফোন, পকেটে বেনসন সিগারেট প্যাকেট। তাদের জন্য আতঙ্কিত থাকেন অভিভাবকরা। নগরীর রামঘাট এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক জানান, তিনি কিছুতেই তার দশম শ্রেণি পড়–য়া সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না। তাকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিলে উল্টো ছেলে হারানোর আশঙ্কা করেন। তিনি বলেন, এই বয়সেই তাকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দিতে হয়। যা সে নেশা গ্রহণে ব্যয় করে।

অনেক স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রাইভেটের কথা বলেও তারা বাবা-মার কাছ থেকে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা নিয়ে প্রাইভেট না পড়ে সেই টাকা ব্যয় করছে নেশায়। কুমিল্লায় সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাং কালচারে কমপক্ষে ছয়জন খুনসহ আহত হয়েছে অনেকে। এমনই একটি গ্রুপের হাতে ২০১২ সালে আওয়ার লেডি অব ফাতেমা গার্লস হাই স্কুলের দুই শিক্ষক জসিম ও আল আমিন এসিডে দগ্ধ হয়েছিলেন আদালত মোড় এলাকায়। অনেক অভিভাবক-সন্তানের ভবিষ্যৎ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় হামলা বা মারধরের বিষয়টি চেপে যান। খন্দকার হক টাওয়ারের এক ব্যবসায়ী বলেন, গ্যাং কালচার অর্থাৎ তরুণ-কিশোর শিক্ষার্থীদের অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার পেছনে প্রথম দায়ী তাদের অভিভাবকরা। ঘর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ বা খোঁজ খবর নিয়মিত রাখলে সন্তান বেপরোয়া হওয়ার আগেই লাগাম টানতে পারত। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত সন্ধ্যার পর আড্ডায় পেলে তাদের অভিভাবকদের ডেকে না দিয়ে সরাসরি আইনের কাছে সোপর্দ করা। এতে অভিভাবকদের মাঝেও একটা অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।

সচেতন নাগরিক কমিটির কুমিল্লা শাখার সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, সন্ধ্যার পর স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থীদের অলিতে-গলিতে, রাস্তার পাশে, বিপণিবিতানের সামনে দল বেঁধে কিসের আড্ডা। এটা নিয়ন্ত্রণে সবার আগে অভিভাবক ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা রাখতে হবে।

শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও সম্পাদক অধ্যক্ষ সফিকুর রহমান কিশোর-তরুণদের বখে যাওয়ার বিষয়ে প্রথমেই অভিভাবকদের দোষারোপ করে বলেন, শিশু বয়সেই তারা সন্তানদের হাতে দামি মোবাইল তুলে দেন। এই অল্প বয়সেই তারা ইন্টারনেট ব্যবহার শিখে ফেলে। এরপর স্কুল জীবন শেষ হতে হতেই সন্তানদের আবদার পূরণে মোটরসাইকেল কেউবা প্রাইভেট কার হাতে তুলে দেন। এ থেকে শুরু হয় সন্তানদের বখে যাওয়া। যা পরবর্তী সময়ে সন্তানদের নিয়ন্ত্রণে অসম্ভব হয়ে উঠে। এ সময় অপ্রত্যাশিত অশ্লীল ছবি দেখা, মাদক সেবনসহ পরবর্তী সময়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এসব তরুণ-কিশোররা। তাদের নিয়ন্ত্রণে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে মোবাইল, বাইক নিষিদ্ধের দাবিও জানান অধ্যক্ষ সফিকুর রহমান।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও আইন বিভাগের প্রভাষক সাঈদা তালুকদার রাহি বলেন, জন্মসনদ সঠিক রেখে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করলে বয়স লুকানোর সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়াও অপ্রাপ্তরা ইন্টারনেট সুবিধা পেতে পারে কি না বা ইন্টারনেট সুবিধা তরুণ-কিশোরদের মেধা বিকাশ কতটা প্রয়োজন রয়েছে সে বিষয়ে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিলে শিশু-কিশোরদের অশ্লীলতা থেকে দুরে রাখা যাবে, যা মেধা বিকাশে ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি মনে করেন।

"