তরুণরা ঝুঁকছে খামারে

* এসেছে বৈচিত্র্য * প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

হাঁস-মুরগি পালন, গরুর খামার বা মাছের খামার করে ভাগ্য বদলে যাওয়ার গল্প বাংলাদেশে এখন আর নতুন কোনো ঘটনা নয়। কৃষিনির্ভর এই দেশের কৃষক ও খামারি পর্যায়ে চালু হয়েছে নতুন মেরূকরণে হেঁটে চলার গল্প। একসময় গ্রামাঞ্চলে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালনই ছিল কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস। পর্যায়ক্রমে পোলট্রি সেক্টরে এসেছে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির পালন। গ্রামীণ বেকার যুবক ও নারীরা অনেকেই ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির খামার করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। সময় বদলেছে। কালের পালাবদলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষিত বেকার যুবক ও নারীরা হাঁস, মুরগির বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন বিকল্প প্রজাতির পাখির খামার। এদের মধ্যে টার্কি, তিতির, উটপাখির খামার উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে গরু, ছাগল পালনের পাশাপাশি বিকল্প পশুর খামারে ঝুঁকছেন শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম। বাংলাদেশের কৃষি খামারে যুক্ত হয়েছে হরিণ, কুমির, সাপ, উটের মতো বৈচিত্র্যময় পশু। তবে পর্যাপ্ত প্রাণী চিকিৎসকের অভাবে ব্যবসা চালাতে এখন হিমশিম পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তাদের। সচেতনতার অভাবে অনেকে ঝুঁকছেন ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়েটিক ব্যবহারে। এ খাতের ব্যবসায়ীদের দাবি এতে খরচ বাড়ছে অথচ হচ্ছে না কাক্সিক্ষত উৎপাদন। তাছাড়া কৃষি উপখাত হিসেবে পোলট্রিতে ভালো সম্ভাবনা সত্ত্বেও রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে মুরগির রোগবালাই বেশি হয়। অথচ এ খাতে নেই চাহিদা অনুযায়ী ভেটেরিনারি সার্জন বা প্রাণী চিকিৎসক।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে শুধু গরু-ছাগলের সংখ্যা আড়াই কোটির বেশি। অথচ এক্ষেত্রে চিকিৎসক রয়েছে ১২০০ জন। অর্থাৎ প্রতি ২০ হাজারে একজন চিকিৎসক। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ও গৃহস্থালি মিলিয়ে মুরগির সংখ্যা ২৮ কোটি।

পোলট্রি শিল্পেও চিকিৎসা দিচ্ছেন এই চিকিৎসকরাই। সংশ্লিষ্টরা বলেন, এতে ব্যাহত হচ্ছে খামারিদের সচেতনতা। পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, বর্তমানে সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে পোলট্রি খামার রয়েছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার।

টার্কি, তিতির ও শৌখিন মুরগির খামার : পাশ্চাত্যের খাবার টার্কির জয়জয়কার এখন বাংলাদেশে। বছর কয়েক আগেও এ দেশে টার্কিকে খুব বেশি চিনতো না মানুষ। কিন্তু টার্কি পালন লাভজনক হওয়ায় দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই পাখিটি। সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে সাত হাজারের বেশি টার্কির খামার গড়ে উঠেছে। স্বল্প সময়ে অধিক ওজন ও বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় টার্কির খামারে আগ্রহী হয়েছে হাজার হাজার উদ্যোক্তা। সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানেরও। বর্তমানে সর্বোচ্চ সংখ্যক টার্কির খামার গড়ে উঠেছে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলগুলোতে। কুমিল্লা, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহে টার্কির খামার বেশ চোখে পড়ে। ঢাকাসহ সারা দেশের শহরাঞ্চলে টার্কির মাংসের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া টার্কির ডিম এবং বাচ্চা বিক্রি করে খামারিরা লাভবান হচ্ছেন। টার্কিকে পোলট্রি শিল্পের আওতায় এনে খামারিদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশে বিকল্প পাখির খামার হিসেবে নতুন একটি নাম হচ্ছে কাদাকনাথ মুরগির খামার। ডিম সাদা, তবে পালক, চামড়া এবং মাংস কালো হওয়ায় এই জাতটি নিয়ে এরই মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।

টার্কি তিতির ও কাদাকনাথের পাশাপাশি বেশকিছু শৌখিন মুরগির খামার বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ময়ূর, সিল্কি, বেনথাম, সেব্রাইট, পলিশক্যাপ ও দেশি কালিম পাখির খামার।

হরিণের খামার : গরু, মহিষ আর ছাগলের খামারের বিকল্প হতে পারে হরিণের খামার। এরই মধ্যে সারা দেশে বেশ কয়েকটি জায়গায় ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে হরিণের খামার। বগুড়ার শিবগঞ্জের হাজী মোখলেসুর রহমান হরিণ পালন করে আসছেন প্রায় একযুগ ধরে। সরকারি নিয়ম মেনে মাত্র এক জোড়া হরিণ কিনে খামার শুরু করেন। বর্তমানে তার কাছে ১২টি হরিণ আছে। আরো ১৫টি বিক্রি করেছেন।

ঝালকাঠি জেলার নলছিটি ফেরিঘাটের পাশে ব্যবসায়ী কাজী আলমগীরের হরিণ এবং ময়ূরের খামার। নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার আব্দুল কাদের ভূঁইয়ার হরিণ খামারে রয়েছে ২৫টি হরিণ। ফেনীর শুভপুরে এক অস্ট্রেলিয়া প্রবাসীর হরিণের খামারেও প্রায় ২৫টি হরিণ আছে। বরিশালের আগৈলঝারা উপজেলার মৃদুল সাহার খামারে বর্তমানে হরিণ আছে ২৬টি। বিক্রি করেছেন ২৪টি। নরসিংদী সদরের আলীজান জুটমিলে মোশারফ হোসেন গড়ে তুলেছেন হরিণ, উটপাখি ও ইমু পাখির খামার। সারা দেশে ব্যক্তি উদ্যোগে এমন অসংখ্য হরিণের খামার রয়েছে, যা সরকারি নীতিমালায় সহজলভ্য হলে এবং বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ ও বিক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হলে হরিণ পালন হবে লাভজনক একটি ক্ষেত্র।

প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা : নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে প্রচলিত কৃষি খামারের পাশাপাশি বিকল্প এই সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট খামারিরা। পোলট্রি শিল্পে টার্কি, তিতির ও শৌখিন পাখি পালনে সরকারি ঋণ ও চিকিৎসা সহায়তা দেয়া গেলে যেমন দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে তেমনি হরিণের খামারে প্রয়োজন সহজ নীতিমালা। হরিণের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত হলে এবং উটপাখির খামার সম্প্রসারণে সরকারি প্রশিক্ষণ চালু হলে দেশের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে এই ক্ষেত্রগুলো। অন্যদিকে সাপের খামারের যথাযথ অনুমতি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে সাপের খামারি স্বাবলম্বী হবে দেশের শিক্ষিত তরুণরা। সাপের বিষ রফতানি করে আয় হবে কাক্সিক্ষত বৈদেশিক মুদ্রা।

 

"