হলুদে ক্ষতিকর সিসা!

শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

রান্নায় ব্যবহার করা হলুদে ক্ষতিকর মাত্রায় সিসা পেয়েছেন আইসিডিডিআরবি ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা। হলুদকে উজ্জ্বল করতে ব্যবহার করা হচ্ছে এই রাসায়নিক। গবেষকরা সতর্ক করছেন, সিসাযুক্ত হলুদ দীর্ঘ সময় খেলে ক্যানসারসহ নানা রোগ হতে পারে। গর্ভের শিশুর মেধাবিকাশ ব্যাহত হওয়াসহ দেখা দেয় নানা জটিলতা।

রাজধানীর কারওয়ানবাজারের মসলা বাজার দোকানে সাজানো হরেক রকমের হলুদ। কোনোটি স্বাভাবিক বর্ণের, কোনোটির রং অস্বাভাবিক হলুদ। মসলা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম অতি হলুদ বর্ণকেও স্বাভাবিক দাবি করলেন। স্বাভাবিক বর্ণের হলুদকে অস্বাভাবিক হলুদ করতে ব্যর্থ হয়ে এবার নিজেই দাবি তোলেন, হলুদকে অতি উজ্জ্বল করতে রঙের ব্যবহার বন্ধ হোক। ছয় বছর আগে গর্ভবতী মায়েদের রক্তে বেশি মাত্রায় সিসা পান আইসিডিডিআরবির গবেষকরা। সিসার উৎস খুঁজতে মাটি-পানিসহ পরীক্ষা করা হয় বিভিন্ন নমুনা। পরে হলুদে সিসার মিশ্রণ খুঁজে পান তারা। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, সে দেশে বাস করা বাংলাদেশিদের রক্তেও অতি মাত্রায় সিসা আছে, যার মূল উৎস হলুদ।

গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, গুঁড়া হলুদে ব্যবহৃত বিষাক্ত সিসা মানব শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সিসা মিশ্রিত হলুদ দীর্ঘদিন ধরে খাওয়া হলে হৃদরোগ, প্রাপ্তবয়স্কদের স্মৃতিভ্রম, মাথাব্যথা, বিষণœতা, হরমোনজনিত রোগ ও ক্যানসার সৃষ্টি হতে পারে। এতে রক্তের স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত এবং শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

খাদ্যে ব্যবহৃত হলুদে মারাত্মক বিষাক্ত সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। হলুদের রঙ উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় করতে অসাধু ব্যবসায়ীরা সিসা মিশিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইসিডিডিআরবি পরিচালিত এক যৌথ গবেষণায় এমন সব তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রীত হলুদের গুঁড়ার রঙ উজ্জ্বল করতে মারাত্মক বিষাক্ত সিসা (লেড ক্রোমেট) ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের ফলে এ ধরনের হলুদের ক্ষতিকর সিসা অস্থি মজ্জায় ক্রিয়া করে রক্তের স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এমনকি মানবদেহে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। তাই বাজারে বিক্রীত গুঁড়া হলুদের পরিবর্তে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে হলুদ গুঁড়া করে ব্যবহারের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ অনুযায়ী হলুদ প্রক্রিয়াজাতকরণে কোনো ধরনের উজ্জ্বল রঙ বা সংযোজন থেকে সব ধরনের মসলা উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে হলুদে এসব রঙ বা লেড ক্রোমেট মেশানো হচ্ছে। যা বাজারে পিউরি, পিপড়ি, বাসন্তী রঙ, কাঁঠালি রঙ নামে পরিচিত। এ রঙ মূলত ছবি আঁকা বা আলপনা আঁকার কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, উজ্জ্বল রঙ নয়Ñ এমন হলুদ আকর্ষণীয় করতে বিক্রেতারা হলুদে লেড ক্রোমেট ব্যবহার করে। বিশেষ করে যেসব ব্যবসায়ী হলুদ গুঁড়ো করে বাজারজাত করেন, তারা এটি ব্যবহার করেন। এতে হলুদের রঙ উজ্জ্বল হয় এবং ক্রেতারা আকৃষ্ট হন।

বাজারে খোলা বা প্যাকেটজাত হলুদের গুঁড়ার মধ্যে উচ্চমাত্রার লেড ক্রোমেটের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫০০টিরও বেশি নমুনায় (হলুদ, হলুদের অবশিষ্ট এবং ব্যবহৃত স্থানের মাটি) এর উপস্থিতি পেয়েছে। এর পরিমাণ প্রতি গ্রামে ১ হাজার ১৫২ মাইক্রোগ্রাম থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ২৫৭ মাইক্রোগ্রাম। এর সঙ্গে জড়িত দেড় শতাধিক ব্যবসায়ী হলুদে রঞ্জক হিসেবে সিসা মেশানোর কথা গবেষকদের কাছে স্বীকার করেছেন। নতুন এ গবেষণায় হলুদে সিসার যে পরিমাণ পাওয়া গেছে, তা অন্যসব অনুরূপ গবেষণায়প্রাপ্ত ফলাফলের চেয়ে ২ থেকে ১০ গুণ বেশি।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের মানুষ রান্না করা তরকারির রঙ উজ্জ্বল করতে প্রধানত হলুদ ব্যবহার করে। তাই এ দেশের মানুষের কাছে হলুদের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। হলুদে ক্ষতিকর রঙ মেশানোর প্রধান কারণও এটি। স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করে গবেষক দল বলেছে, ক্রেতারা হলুদে বিষাক্ত রঙ ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানতে পারলে তা আর ব্যবহার করবে না। বাজার থেকে গোটা হলুদ কিনে নিজেরাই গুঁড়ো করে বা পিষে সেগুলো ব্যবহার করবেন।

এ প্রসেঙ্গ আইসিডিডিআরবির এনভায়রনমেন্টাল ইন্টারভেনশন ইউনিটের গবেষক ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, যেসব মিলে হলুদ গুঁড়া করা হয়, সেই মিলগুলোর মাটির নমুনাতেও প্রতি গ্রাম মাটিতে সর্বাধিক ৪ হাজার ২৫৭ ক্রোমেট সিসার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। মিলে হলুদ গুঁড়া করার আগে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের হলুদ ড্রামে বা বড় পাত্রে লেড ক্রোমেট গোলানো পানিতে ভিজিয়ে রাখে। এতে হলুদের রঙের অস্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য আসে। তারা (অসাধু ব্যবসায়ীরা) শুধু ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এ বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহার করে থাকেন। স্থানীয় পর্যায়ের হলুদ গুঁড়া বিক্রেতা এবং প্যাকেটজাত হলুদ গুঁড়া বিক্রেতারা এগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে।

তিনি বলেন, এ ধরনের হলুদ ব্যবহারে শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবকি বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এছাড়া হৃদরোগসহ নানা ধরনের রোগের সৃষ্টি করে। বাজারের এসব হলুদ গুঁড়া পরিহার করে হলুদ কিনে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ভাঙিয়ে নিতে তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম শামছুজ্জামান বলেন, যে কোনো ভারী ধাতু মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। সিসা একটি মারাত্মক ভারী ধাতু। মানুষ খাবারের মাধ্যমে বা যে কোনোভাবে সিসা গ্রহণ করলে, সেটি রক্তে মিশে অস্থিমজ্জায় প্রভাব বিস্তার করে। একপর্যায়ে শরীরে স্বাভাবিক রক্ত উৎপাদন, বিশেষ করে লোহিত কণিকা উৎপাদন ব্যাহত করে। এতে মানুষের মধ্যে শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। এ অবস্থাকে বলা হয় হেমোক্রোমটেসিস, যা একপর্যায়ে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।

 

"