এক উঠানে মসজিদ-মন্দির

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট

ধর্ম যার যার, উৎসব সবার- এ কথাটির যথার্থই প্রমাণ মিলে সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ি বাজারে। ধর্মীয় সম্প্রতির এক অনন্য উজ্জ্বল নিদর্শন একই উঠানে মসজিদ ও মন্দির। একপাশে ধূপকাটি অন্যপাশে আতরের ঘ্রাণে মুখর। একপাশে উলুধ্বনি, অন্যপাশে মসজিদে চলছে আল্লাহর জিকির। এভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যুগ যুগ ধরে চলছে পৃথক দুটি ধর্মের উপাসনালয়। দেশের ইতিহাসে এটিই একমাত্র জায়গা, যেখানে এক উঠানে মসজিদ-মন্দির।

ধর্মীয় সম্প্রীতি দেখতে আসতে হবে লালমনিরহাট শহরে। এই শহরের কালীবাড়ি এলাকার পুরান বাজার জামে মসজিদ ও কালীবাড়ি কেন্দ্রীয় মন্দিরটি একই উঠানে রয়েছে সম্প্রীতির বন্ধনে। যে যার মতো ধর্ম পালন করে চলে যাচ্ছে। এখন চলছে শারদীয় দুর্গোৎসব।

এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘদিন ধরে একই উঠানে মসজিদ-মন্দির হলেও উভয় ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে থেকে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছে। ধর্ম পালন নিয়ে কখনো কোনো বাকবিতন্ডা পর্যন্ত হয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি। উভয় ধর্মের শালীনতা বজায় রেখেই একই উঠানে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছে উভয় ধর্মের মানুষ। শুধু নামাজ বা পূজা অর্চনাই নয়, উভয় ধর্মের সব ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শান্তিপূর্ণ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়েই পালন করছে এখানকার মানুষ। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। যার অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দেশের নানা প্রান্তে। এমনই একটি দর্শনীয় স্থান লালমনিরহাট জেলা শহরের পুরান বাজার এলাকায় এক উঠানেই মসজিদ ও মন্দির বেশ জনপ্রিয়।

কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষ সনদ চন্দ্র সাহা জানান, ১৫০ বছর আগে কালীমন্দির হিসেবে এ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। যার কারণে এলাকাটির নামকরণও করা হয় কালীবাড়ি। বাজার গড়ে উঠলে বাজারের ব্যবসায়ী ও শহরের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মন্দিরের পাশেই এ পুরান বাজার জামে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে একটা উঠানে চলছে দুই ধর্মের দুই উপাসনালয়।

তিনি আরো জানান, পূজা শুরুর আগে মসজিদ ও মন্দির কমিটি বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত মতে, আজানের সময় থেকে প্রথম জামাত নামাজ পর্যন্ত মন্দিরের মাইক, ঢাকঢোলসহ যাবতীয় শব্দ বন্ধ থাকবে। কিন্তু ওই সময় পুরোহিত ও পূজারিরা কোনো রকম শব্দ ছাড়াই নীরবে তাদের পূজা চালিয়ে যাবেন। নামাজের প্রথম জামাত শেষ হলে মন্দিরের কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক হয়। সামান্যতম বিশৃঙ্খলা হয় না এখানে। তার জন্ম থেকে এভাবে চলতে দেখে আসছেন বলে জানান সনদ চন্দ্র সাহা।

লালমনিরহাট পুরান বাজার কালীবাড়ি দুর্গা মন্দিরের সভাপতি জীবন কুমার সাহা জানান, ১৮৩৬ সালে দুর্গামন্দির প্রতিষ্ঠার আগে এখানে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পুরান বাজার এলাকা অনেকের কাছে কালীবাড়ি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এরপর মন্দির প্রাঙ্গণে ১৯০০ সালে একটি নামাজঘর নির্মিত হয়। এ নামাজঘরটিই পরবর্তীতে পুরান বাজার জামে মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে। এরপর থেকে কোনো বিবাদ ও ঝামেলা ছাড়াই সম্প্রীতির সঙ্গে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করে আসছে দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ।

দুর্গাপূজার সময় ঢাকঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিয়ে সমস্যা হয় কি নাÑ এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোবিন্দ চন্দ্র সাহা বলেন, আমরা মসজিদ ও মন্দির কমিটির সদস্যরা বসে আগেই ঠিক করে নেই, কখন এবং কীভাবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করা হবে। নামাজের সময়গুলোতে সব ধরনের বাদ্যবাজনা বন্ধ রাখা হয় এবং নামাজ শেষে মুসল্লিরা দ্রুত মসজিদ ত্যাগ করে পূজারিদের জন্য সুযোগ করে দেন। এটাই এখানে নিয়মÑ যোগ করেন গোবিন্দ চন্দ্র সাহা।

পুরান বাজার জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফজল মিয়া জানান, একমাত্র লালমনিরহাটেই আছে ধর্মীয় সম্প্রীতির এটি এক জ্বলন্ত প্রমাণ বা উদাহরণ। যুগ যুগ ধরে একই উঠানে চলছে নামাজ ও পূজা অর্চনা। নামাজের সময় মন্দিরের ঢাকঢোল বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে মন্দিরে পূজা চলে পুরোদমে। আজান ও নামাজে তো খুব বেশি সময় লাগে না। এ সময়টুকু তারা (পূজারি) ঢাকঢোলসহ শব্দযন্ত্র বন্ধ রাখেন। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে এ সম্প্রীতির বন্ধনে ধর্মীয় উৎসব পালন করছেন বলে দাবি করেন তিনি।

পুরান বাজার জামে মসজিদ সহকারী ইমাম মওলানা শফিকুল ইসলাম জানান, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। উভয় ধর্মের লোকদের সমান সুযোগ দিয়েই এখানে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয়। তাই ধর্ম পালনে কারো কোনো সমস্যা হয় না। এভাবেই দীর্ঘদিন থেকে এই ধর্মীয় সম্প্রীতি চলে আসছে। ১৫০ বছরে এখানে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ এ জেলার মানুষ। ধর্ম যার যার উৎসব সবারÑ এটাই এখানকার মানুষ লালন করে এবং বিশ্বাস করে। যার মূর্তপ্রতীক এক উঠানে কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি মন্দির ও পুরান বাজার জামে মসজিদ।

"