নওগাঁয় সুদখোরদের খপ্পরে পড়ে ঋণগ্রহীতারা সর্বস্বান্ত

প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

নওগাঁ প্রতিনিধি

গ্রাহকের কাছে প্রাপ্য ঋণের বিপরীতে ফাঁকা চেক গ্রহণ ও পাওনা অর্থের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে চলছে নওগাঁ মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি। এ কারণে এ ঋণদাতা সমিটির বিরুদ্ধে জেলা সমবায় অফিসে অভিযোগ করেছেন এক ভুক্তভোগী। গত বৃহস্পতিবার নওগাঁ শহরের চকএনায়েত মহল্লার ভুক্তভোগী মিজানুর রহমান এ অভিযোগ করেন। এই ভুক্তভোগী আরো জানান, শুধু এই সমিতিই নয়, এলাকায় ব্যাঙের ছাাতার মতো গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন সমিতি চড়া সুদের ব্যববসা শুরু করেছে। এতে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেকেই। বাড়ছে পারিবারিক অশান্তি এবং ঋণগ্রহিতাদের এলাকাছাড়া হওয়ার ঘটনা।

অভিযোগে বলা হয়, নওগাঁ শহরের চকমুক্তার মহল্লার ওমর আলীর ছেলে মোস্তাক আহমেদ পেশায় ইটভাটা ব্যবসায়ী। ব্যবসার প্রয়োজনে গত বছর সদর উপজেলার ভবানীপুর এলাকার ‘নওগাঁ মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা ঋণ নেয়। এই ঋণের বিপরীতে সুদসহ ১৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়। ঋণ নেওয়ার সময় ‘ডাচ্-বাংলা ব্যাংক হিসাব’ নম্বরের একটি ফাঁকা চেকের পাতা জমা দিয়ে মিজানুর রহমান জামিনদার হন। আমার বন্ধু নিয়মিত ঋণের ৮ লাখ ৫৩ হাজার ১০০ টাকা পরিশোধ করে এবং বাকি ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৯০০ টাকা পাওনা রয়েছে। ব্যবসায়িক সমস্যা হওয়ায় বাকি টাকা পরিশোধ করতে বিলম্ব হয়। এতে ‘নওগাঁ মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ রানা আমার বিরুদ্ধে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৯০০ টাকার বিপরীতে ১৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা ওই ফাঁকা চেকে লিখে চেক ডিজঅনার করে মামলা করেন, যা সমবায় আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি জেলা সমবায় অফিসারের কাছে সুবিচার দাবি করেছেন।

‘জেলা সমবায় অফিস থেকে সম্প্রতি এক স্মারকলিপির মাধ্যমে জেলার সব বহুমুর্খী, মাল্টিপারপাস, সঞ্চয় ও ঋণদান, সার্বিক গ্রাম, কৃষি উন্নয়ন সমবায় সমিতির ঋণ বিতরণে ফাঁকা চেক, ডিড, স্ট্যাম্প গ্রহণ না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশ অমান্যের দায়ে সমিতির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, নিবন্ধিত অধিকাংশ সমবায় সমিতি আইনবহির্ভূতভাবে ফাঁকা চেকের বিপরীতে সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করার কথা থাকলেও বেশি লাভের আশায় বাইরে ঋণ বিতরণ করে। আবার অনিবন্ধিত কিছু সমিতি সাইবোর্ড লাগিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে। মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তারা বার্ষিক, মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক মেয়াদে এমনকি দিন হিসেবে চড়া সুদের ব্যবসা করছেন। কেউ ব্যাংকের ফাঁকা চেক ও জমির দলিল বন্ধক রেখে চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করছেন, যা সমাজে দাদন ব্যবসা নামে পরিচিতি পেয়েছে। এই দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। কেউ পরিবার নিয়ে দেউলিয়া হয়েছে এবং আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে এরই মধ্যে জেলায় কয়েকটি স্থানে মানববন্ধন করেছে সচেতন মহল।

সাপাহার সদর উপজেলার করলডাঙ্গা (ডাঙ্গাপাড়া) গ্রামের মজিবর রহমান ম-ল নামের এক দাদন ব্যবসায়ীর খপ্পরে পড়ে উপজেলার শিরন্টি গ্রামের সালেক নামের এক ক্ষুদ্র ওষুধ ব্যবসায়ী তার বশতবাড়ি, জমিজমা সম্পূর্ণ শেষ করে সর্বস্বান্ত হয়ে ৪ বছর ধরে এলাকা ছেড়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অন্যত্র জীবনযাপন করছেন। একই এলাকার মাদ্রাসার শিক্ষক নাসির উদ্দিন প্রয়োজেনর তাগিদে সুদের ওপর টাকা নিয়ে সংসার জীবনের তার সবকিছু হারিয়ে এখন নিঃস্ব জীবনযাপন করছেন।

মহাদেবপুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামের ভুক্তভোগী আবদুল কাদের বলেন, ফলের ব্যবসার জন্য উপজেলার বগের মোড়ে ‘কৃষি প্রগতি উন্নয়ন’ সমিতি থেকে ব্যাংকের একটি ফাঁকা চেক জমা দিয়ে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিই। প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ টাকা করে ৩ মাস কিস্তি দেওয়ার পর ওই সমিতি উধাও হয়ে যায়। সমিতি উধাও হওয়ার আট মাস পর আমার নামে ৫ লাখ টাকার চেকের মামলা দেওয়া হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়, ওই সমিতির মালিক তানভীর ফেরদৌস ও আতিক আমাকে টাকা হাওলাদ দিয়েছেন। মামলার পর থেকে আমি বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছি।

নওগাঁ সচেতন তরুণ প্রজন্মের আহ্বায়ক শফিকুর রহমান মামুন বলেন, সারা দেশে দাদন ব্যবসা ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ যখন অভাব-অনটনের কারণে ঋণ নিয়ে উপকার পাওয়ার আশা করে, সেখানে এটা গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের বিভিন্নভাবে নিষ্পেশিত করা হচ্ছে। অনেকে বাড়িঘর বিক্রি করে দেউলিয়া এবং আত্মহত্যার পথ বেঁছে নিয়েছেন। এই দাদন ব্যবসায়ীরা এমনকি মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি পর্যন্ত করেছেন।

তিনি আরো বলেন, নীতিমালার বাইরে গিয়ে সমবায়গুলো সুদ ব্যবসা করছে। ফাঁকা চেক নিয়ে তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো টাকার অঙ্ক বসিয়ে ডিজঅনার করে মামলা দিয়ে হয়রানি করে। কিছু মহল তাদের ইন্ধন জুগিয়ে সুযোগ করে দিচ্ছে। যার কারণে তারা অনিয়ন্ত্রিত ও অমানবিক হয়ে পড়েছে। এখান থেকে উত্তোরণের জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে, প্রশাসনকে এ ব্যাপারে মূর্খ ভূমিকা পালন করতে হবে। অচিরেই এদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানান তিনি।

নওগাঁ মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ রানা বলেন, ঋণ নেওয়ার সময় জামানত হিসেবে তারা তাদের চেকে টাকার অঙ্ক লিখে দিয়েছিলেন। যেহেতু তারা চেকে টাকার অঙ্ক লিখে দিয়েছেন, সেহেতু সেই পরিমাণ টাকার ওপরই চেক ডিজঅনার করে মামলা দেওয়া হয়েছে। যেহেতু কিছু টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, বাকি টাকা পাওয়া যাবে। আদালতের মাধ্যমে সেটা ফায়সালা করা হবে। তবে অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই।

নওগাঁ জেলা সমবায় অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) হোসেন শহীদ বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে ফাঁকা চেক জমা নিয়ে ঋণ দেওয়া আইনের পরিপন্থি। এর আগে এসব বিষয়ে মাইকিং ও প্রচার এবং নোটিস করা হয়েছে।

নওগাঁ জেলা প্রশাসক হারুন-অর-রশীদ বলেন, জেলার প্রায় সবখানেই কমবেশি দাদন ব্যবসা রয়েছে। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ফাঁকা চেক কিংবা জমির দলিলের বিনিময়ে কেউ প্রতারিত হলে, এ বিষয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ করলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

"