সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর

১০ টাকার চালে অনিয়ম তালিকায় মৃতের নাম

প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

হাসানুজ্জামান তুহিন, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ)

রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাকর্মী, ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্যসহ জনপ্রতিনিধি, চাকরিজীবী এবং সচ্ছলদের নাম রয়েছে ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণ তালিকায়। তাদের নামে চাল উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছে কালোবাজারে। ফেয়ার প্রাইজের এই চাল নিয়ে এমনি ভয়াবহ অনিয়ম ও হরিলুটের তথ্য পাওয়া গেছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে। উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়নে ২৪২০টি, গাড়াদহ ১৯৫৮, পোতাজিয়া ২১৬৮, রূপবাটি ১৯০০, গালা ১৯৫০, পোরজনা ২৭৭৯, হাবিবুল্লাহনগর ২০০০, বেলতৈল ২২০০, খুকনি ২৫০০, কৈজুরি ২৭১৯, সোনাতুনি ২৫০০, নরিনা ২২৪৪, জালালপুর ১৫৭১টি মিলে ১৩টি ইউনিয়নে মোট কার্ডধারীর সংখ্যা ২৩ হাজার ৬৯০ জন হলেও তালিকার প্রায় ৭০ শতাংশই ভুয়া বলে অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় থাকা অধিকাংশ মানুষই জানে না ১০ টাকা কেজি চালের কার্ডের কথা। এমনকি তারা জানে না কীভাবে তাদের নাম তালিকায় ঢুকেছে। একই সঙ্গে ওই তালিকায় রয়েছে মৃত মানুষেরও নাম। এমন ভয়াবহ অভিযোগের তির প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেই। সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, খাদ্য কর্মকর্তা, ট্যাগ অফিসার ও ডিলারদের যোগসাজশে কৌশলে জনগণের কাছে থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নিয়ে ভুয়া তালিকা তৈরি করে এসব চাল আত্মসাৎ করেছেন বলে জানা গেছে। শুরু থেকেই সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণে এমন অনিয়ম করে আসছে সংশ্লিষ্টরা। দুস্থদের মধ্যে বিতরণের নাম করে সরকারি গোডাউন থেকে চাল উত্তোলন করা হলেও প্রায় সব চাল চলে যাচ্ছে কালোবাজারে। বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে বেশি দামে। কালোবাজারে বিক্রি হওয়া অর্থ ভাগবাটোয়ারা হয়ে চলে যাচ্ছে প্রভাশালীদের পকেটে।

উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের ২১৬৮ জন কার্ডধারীর তালিকায় থাকলেও তা কেবল কাগজে-কলমেই বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে উত্তোলন করা চাল বিতরণ করা শেষ হয়েছে বলে কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে। মাস্টাররোল তৈরি হয়েছে চাল গ্রহিতাদের আঙুলের টিপসই নিয়ে।

বিষয়টি যাচাই করতে এই প্রতিবেদক প্রথমেই খোঁজ নেন পোতাজিয়া ইউনিয়নের কাকিলামারি গ্রামে। কথা হয় তালিকায় থাকা ১১২৯নং কার্ডধারী জুলু মোল্লার ছেলে হানেফের সঙ্গে। ১০ টাকা কেজি দরের চালের কার্ড আছে কি না জিজ্ঞেস করতেই তিনি অবাকে হয়ে বলেন, ‘আমি জীবনেও ইউনিয়ন থেকে কোনো কিছু পাই নাই বা নেই নাই। শুনেছি ১০ টাকা কেজি দরে সরকার চাল দেওয়া হচ্ছে কিন্তু কখন কিভাবে কাদের এই চাল দেওয়া হয় সেটা আমার জানা নেই।’

এবার আরেকটু তালিকা ধরে খুঁজে বের করা হয় একই গ্রামের জয়নুল আবেদিনের ছেলে আব্বাস মোল্লা, মাহমুদ আলীর ছেলে আশরাফ মোল্লা, আরশাদ আলীর স্ত্রী জাহানারা খাতুন, হাফিজ মোল্লার ছেলে নিজাম উদ্দিন, ছামাদের ছেলে ইয়াছিন এবং রহিম মোল্লার ছেলে মুকুল মোল্লাকে। তাদের সঙ্গে কথা বলে উঠে আসে জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র। তালিকায় প্রত্যেকের নাম এবং চাল উত্তোলনের টিপসই আছে মাস্টাররোলে। অথচ কেউই জানে না কিভাবে তাদের নাম তালিকায় ঢুকল। জীবনে ১ কেজি চালও পায়নি পরিষদের তরফ থেকে। অথচ তাদের নামে বছরের পর বছর চাল উত্তোলন হয়ে আসছে।

পুরো গ্রাম খুঁজেও চাল পেয়েছে এমন কাউকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু একটি ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। চালবাজির জালিয়াতি থেকে বাদ পড়ছে না মৃত ব্যক্তিরাও। মৃত ব্যক্তির টিপসই দিয়ে দিচ্ছে ওই দুর্নীতিবাজরা। এমনই ভয়াবহ তথ্য পাওয়া যায় আবদুর রশিদের স্ত্রী ময়না খাতুনের কাছে গিয়ে। তালিকায় স্বামী স্ত্রী দুজনেরই নাম আছে। ময়না খাতুনের কার্ড নাম্বার ১১৩৭ এবং স্বামী রশীদের কার্ড নাম্বার ১১৩৮। অথচ আবদুর রশীদ মারা গেছেন ৫ বছর আগে। এ বিষয়ে ময়না খাতুন জানান, তিনি জানেন না কিভাবে তাদের নাম এই তালিকায় উঠেছে। কখনো পরিষদ থেকে কোনো প্রকার চালই তিনি পাননি।

এভাবে পোতাজিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়। দুর্নীতি এবং জালিয়াতির ব্যাপারে পোতাজিয়ার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইউপি সদস্য জানান, পরিষদের চেয়ারম্যান, ট্যাগ অফিসার এবং উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা জোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এমন জালিয়াতি করে সব চাল আত্মসাৎ করছে। চাল দেওয়ার কথা বলে জনগণের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নিয়ে কাউকে কিছু না দিয়ে জালিয়াতি করে আসছে চেয়ারম্যান।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. ইয়াছিন আলীকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের সদুত্তর না দিয়ে অনৈতিক প্রস্তাব দেন এবং বলেন, আপনারা (সাংবাদিকরা) ম্যানেজ করে নেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হুসেইন খান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গত, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ৫০ লাখ পরিবারের মধ্যে ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণ কর্মসূচি চালু রয়েছে।

"