সবুজ হচ্ছে বার্সেলোনা

প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন বিশ্বের দেশে দেশে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। বৃহত্তর উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে বার্সেলোনা শহর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে সবুজায়ন এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের বিশাল উদ্যোগ শুরু করেছে। সবুজ পাহাড় ও ভূ-মধ্যসাগরের মাঝে বার্সেলোনা স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। লাখ লাখ মানুষ প্রতি বছর এই শহরে আসেন। শুধু শহরের অভিনব পরিবেশ উপভোগ করতে নয়, স্থপতি আন্টোনি গাউডির কাসা মিলা ও সাগ্রাদা ফামিলিয়ার মতো বিশ্বখ্যাত ভবনও তারা নিজের চোখে দেখতে চান।

এবার বার্সেলোনা পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও খ্যাতি অর্জন করতে পারে। পৌর পরিষদের নগর সংক্রান্ত পরিবেশবিদরা ২০৩০ সালের মধ্যে বাড়তি ১৬০ হেক্টর সবুজ করে তোলার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছেন। অর্থাৎ বাসিন্দা প্রতি এক বর্গ মিটার সবুজ অংশ। বার্সেলোনা পৌর পরিষদের অক্টাভি বোরুয়েল ত্রানচ বলেন, ‘এই পরিকল্পনা অবশ্যই বড় আকারের উচ্চাকাক্সক্ষা বটে। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারলে স্থানীয় মানুষের অনেক সুবিধা হবে। সবুজ এলাকা দূষণ শুষে নিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।’

এমন পরিবর্তনের সত্যি প্রয়োজন রয়েছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বার্সেলোনা শহরের গড় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়েও বেড়ে গেছে। এখন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে মানুষের মনোভাবে পরিবর্তন ও একাধিক সবুজ প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শহরের কেন্দ্রে গ্লোরিয়াস স্কোয়্যারে বিশাল খনন কাজ চলছে। শহরের ব্যস্ততম পরিবহন কেন্দ্র বিশাল নির্মাণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। কাজ শেষ হলে যানবাহন মাটির নিচে সুড়ঙ্গ দিয়ে যাতায়াত করবে। ওপরে বিশাল সবুজ পার্ক সৃষ্টি হবে। ত্রানচ বলেন, ‘ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা থেকে সরে এসে আমরা এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই যেখানে হাঁটা, সাইকেল চালানো অথবা গণপরিহন ব্যবস্থা ব্যবহার সহজ হয়ে উঠে।’

স্কোয়্যারের একটি অংশের কাজ শেষ হয়ে গেছে। শহরের নতুন এই সবুজ ফুসফুসের স্বাদ পেতে অনেক মানুষ সেখানে যাচ্ছেন। কিছু ছোট প্রকল্পও চলছে। যেমন গাছপালা কীটপতঙ্গের হাত থেকে রক্ষা করতে সেগুলোর চারপাশে বিশেষ ধরনের ফুলগাছ লাগানো হচ্ছে। এ ছাড়া গোটা শহরে সবুজ অংশগুলোর মধ্যে এক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজও চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করতে অদূর ভবিষ্যতে হাজার হাজার বাড়ির ছাদে আরো বেশি খাড়া বাগান সৃষ্টি করা হচ্ছে। সেখানে প্রতিবেশীরা জামা-কাপড় শুকাতে গিয়ে গল্পগুজব করে থাকেন। বার্সেলোনা পৌর পরিষদের জুয়ান ব্যার্নার্দো মার্তিন মনে করেন, এর ফলে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যাবে। তিনি বলেন, ‘বার্সেলোনা শহরের অবকাঠামো আগেই তৈরি হয়ে গেছে। তাই এখন নতুন করে বাগান সৃষ্টি করা কঠিন। বারান্দা, ছাদ ও বাড়ির দেওয়াল সবুজ করে তোলাই একমাত্র সুযোগ।’

তবে ছাদে এমন পরিবর্তনের আগে বাড়িঘরের কাঠামো পরীক্ষা করতে হয়। তা ছাড়া ফ্ল্যাটের মালিকদেরও প্রকল্পে অর্থ ঢালতে হয়। পৌর কর্তৃপক্ষ এমন গাছপালা বেছে নিচ্ছেন, যেগুলো অত্যন্ত তাপ প্রতিরোধী এবং যেগুলোর কম পানির প্রয়োজন হয়। সেই পানিও বৃষ্টির পানির ট্যাংকে জমা রাখার চেষ্টা করা হয়।

নতুন এই সবুজ অংশ ছাদে উত্তাপের মাত্রা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। ফলে নিচের ফ্ল্যাটগুলোর তাপমাত্রাও কমে যায়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও হিটিংয়ের প্রয়োজন কমে যায়। মার্তিন বলেন, ‘এটা থার্মাল ইনসুলেশনের মতো। পাথর, নুড়ি পাথর, মাটি এবং অবশ্যই গাছপালা তার নির্দিষ্ট কাঠামোর সাহায্যে একসঙ্গে এক ধরনের বাফার বা ফাঁপা অংশ সৃষ্টি করে, যা ভবন ও তার আশপাশের অংশের জন্য ইনসুলেশন সৃষ্টি করে।’

সবুজায়নের এই পরিকল্পনা বার্সেলোনার ভবিষ্যতের জন্য বিশাল বিনিয়োগ। গত বছর কর্তৃপক্ষ এই লক্ষ্যে কমপক্ষে ৬ কোটি ইউরো ব্যয় করেছে। নতুন প্রজন্মও বড় অবদান রাখছে। যেমন স্থানীয় একটি স্কুলে শিশুরা তাদের নতুন গাছপালা ও ছাদের বাগানের দেখাশোনা করছে। প্রকৃতির জন্য তাদের মনে সত্যি শ্রদ্ধাবোধ জন্মাচ্ছে। এক শিশুর মতে, গাছপালারও আবেগ আছে, তাই তাদের দেখাশোনা করতে হয়। সবুজের এত বৈচিত্র্য, হাতের নাগালেই তাজা শাকসবজি এবং তাজা বাতাসের পাশাপাশি এই পরিকল্পনার আওতায় শহরে আরো বন্যপ্রাণী ও পাখি আকর্ষণের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। প্রকৃতিকে কাছে নিয়ে আসার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীকে বার্সেলোনা শহরে বাসা বাঁধতে উদ্বুদ্ধ করবে।

"