অনুমতি ছাড়া হাসপাতাল!

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

হাসপাতাল পরিচালনা করার জন্য যে কাগজপত্র প্রয়োজন তার কোনোটিই নেই। নেই সিটি করপোরেশনের অনুমতিপত্রও। পাশাপাশি ড্রাগ লাইসেন্স, নারকোটিকস লাইসেন্স, ডিজি হেলথের অনুমতি বা পরিবেশের ছাড়পত্রও নেই। তবে আছে অদৃশ্য ইশারা; করা হয় জামায়াত-শিবিরের সভাসহ সরকারের বিরুদ্ধে নানা পরিকল্পনা। এ ছাড়া রোগী মারা গেলে স্বজনরা প্রায়ই লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায় নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর। ফলে পুরো এলাকার পরিবেশ পাল্টে যায়। হাসপাতালটির নাম ‘ইউরো বাংলা হার্ট হাসপাতাল’। রাজধানীর আবাসিক এলাকা লালমাটিয়ার ডি-ব্লকে এটির অবস্থান।

হাসপাতালটির নীতি-নির্ধারকদের রাজনৈতিক মতাদর্শও নিয়ে রয়েছে নানা নেতিবাচক সমালোচনা। স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. কামরুল আহসান ছিলেন আলবদর কমান্ডার এবং পরিচালক ডা. আলী আশরাফ খান জামায়াতের রোকন। জানা যায়, এ ধরনের হাসপাতাল পরিচালনা করার জন্য যে কাগজপত্র প্রয়োজন তার কোনোটিই নেই। নেই সিটি করপোরেশনের অনুমতিপত্রও। পাশাপাশি, ড্রাগ লাইসেন্স, নারকোটিকস লাইসেন্স, ডিজি হেলথের অনুমতি বা পরিবেশের ছাড়পত্র থাকার কথা থাকলেও সেটি-ও নেই বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, হৃদরোগবিষয়ক বিশেষায়িত হাসপাতাল বলা হলেও এ সংক্রান্ত কোনো আধুনিক যন্ত্রাংশ বা মেশিন সামগ্রীও নেই। ফলে দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে যেসব রোগীরা এখানে আসেন বেশির ভাগই হয়রানির শিকার হন। এমনকি অনেক রোগী শুশ্রƒষার অভাবে মৃত্যুবরণ করেন। এসব অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ে প্রায় হাসপাতালটির ভেতর-বাইরে হইচই ও শোরগোল লেগেই থাকে। লালমাটির ওই এলাকাটি আবাসিক হওয়ায় সেখানকার বাসিন্দারা পরিবার-পরিজন নিয়ে অস্বস্তিতে বসবাস করছে।

এদিকে, হাসপাতালটিতে আইসিইউ থাকলেও তার কোনো অনুমোদন নেই এবং একমাত্র ফার্মেসিটিও চললে অবৈধ পন্থায়। এই হাসপাতালটির বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্ত্বেও যেকোনো প্রশাসন অনেকটা নির্বিকার। প্রশাসনের সহায়তা না পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা সম্প্রতি মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদফতরে (ডিজি হেলথ) একটি লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু কোনো সুফল পাননি।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ করেন লালমাটিয়ায় বসবাসকারী মুন্সী মো. রইচ উদ্দিন। তিনি বলেন, লালমাটিয়া আবাসিক এলাকায় অভিজাত লোকজনের বসবাস। বর্তমানে এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এই ইউরো বাংলা হার্ট হাসপাতাল। হাসপাতালটির কারণে আমরা নানা সমস্যায় ভুগছি। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের রোগী আসে এবং অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায়ই রোগী মারা যায়। রোগীর স্বজনরা প্রায়ই লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায় নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর। ফলে পুরো এলাকার পরিবেশ পাল্টে যায়। হাসপাতালকে কেন্দ্র করে সামনের রাস্তা দখল করেছে হকাররা। যার কারণে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এতে নাকাল হন এলাকার লোকজন।

হাসপাতালটিতে রোগী সাপ্লাই দেয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কতিপয় দালাল। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এখানে রোগী পাঠানো হয়। আইসিইউর পারমিশন নেই। রিং ব্যবসার বৈধ কাগজপত্র নেই, পুরোনো মেশিন দিয়ে রিং পরাতে গিয়ে প্রায়ই রোগী মারা যায়। হৃদরোগের মতো জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা চলে এখানে। অবৈধ হাসপাতাল ব্যবসার পাশাপাশি এখানে চলে তাদের রাজনৈতিক মিটিং-আলোচনা।

সারা দেশের জামায়াতপন্থি ডাক্তারদের একত্রিত করতে ডা. কামরুল আহসান জাতীয় ডক্টরস ফোরাম নামে একটি সংগঠন করেছেন। যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। এ সংগঠনের মধ্য দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তারা। তার প্রধান সহযোগী ডা. আনোয়ারুল আজিম। যার মাধ্যমে তিনি জামায়াতের অর্থ জোগান দেন। ইউরো বাংলা হার্ট হাসপাতালটি জামায়াতের একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে বসেই রোগীর চিকিৎসার নামে তারা জামায়াত-শিবিরের সভাসহ সরকারের বিরুদ্ধে নানা পরিকল্পনা করে আসছেন।

জানা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এই হাসপাতালে জামায়াত-শিবিরের গোপন বৈঠক চলাকালীন ডা. কামরুল আহসান এবং ডা. আলি আশরাফসহ কয়েকজন নেতাকর্মী পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তাদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়, যার নং-৮৪/২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ইং। পরবর্তী সময়ে তারা জামিনে বের হয়ে আসে। জামিনে বের হওয়ার পর একই কর্মকা-ের অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হয়, যার নং ২৬(০৯)১৮, ৫৩(০৯)১৮, ৫৬(০৯)১৮, ৬৫(০৯)১৮ ও ৬০(০৯)১৮। এ ছাড়াও হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. কামরুল আহসান ও এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর ডা. আলী আশরাফ খানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে রয়েছে অসংখ্য মামলা।

এলাকাবাসী জানান, ইউরো বাংলা হার্ট হাসপাতালটি আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। রাতে গাড়ির শব্দদূষণ, এলাকার পরিবেশ বিনষ্ট, ডাক্তাররা জামায়াত নেতা হওয়ায় বহিরাগতদের আনাগোনায় এলাকাবাসী ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় বসবাস করছেন। তারা হাসপাতালটি সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

 

"