ওসি ও পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি

ওসির বিরুদ্ধে ডিআইজির কাছে অভিযোগ করায় সাবেক এক পুলিশ সদস্যের বিধবা স্ত্রীকে থানায় মারধর করেছেন বরিশালের উজিরপুর মডেল থানার ওসি শিশির কুমার পাল। এছাড়া রাশিদা বেগমের (৬০) গালে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে ওসির ড্রাইভার পুলিশ সদস্য জাহিদ হোসেন। ওসি শিশির কুমার পাল তার ব্যাপারে এ অভিযোগ নাকচ করেছেন।

এ ঘটনার পরপরই নির্যাতনের শিকার ওই বৃদ্ধা থানাসংলগ্ন একটি চায়ের দোকানের সামনে চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক স্থানীয় সংবাদকর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়ার পর ওসির হাতে মারধরের শিকার বৃদ্ধা রাশিদা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জাহিদ পুলিশ এই চায়ের দোকানে (থানাসংলগ্ন পশ্চিম পাশে বাচ্চুর দোকান) বসে আমার গালে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। দেয়ালের সঙ্গে আমার মাথা ঠুকিয়েছে। পিঠে ও ঘাড়ে ছয় থেকে সাতটি ঘুসি দিয়েছে।

রাশিদা বেগম আরো বলেন, জাহিদ পুলিশের হাতে মারধরের শিকার হয়ে আমি থানার মধ্যে গিয়ে ওসি শিশির কুমার পালের রুমে গিয়ে বিষয়টি জানাই। এ সময় সেখানে উপস্থিত থানার আরো একজন পুলিশ সদস্য ওসিকে বলে স্যার ঘটনাটি সত্য। এ কথা শোনার পরই ওসি শিশির কুমার চেয়ার থেকে উঠে আমাকে অমানুষিক নির্যাতন করে তার কক্ষ থেকে ঘাড় ধরে বের কওে দেন।

বৃদ্ধা রাশিদা জানান, তিনি মাদারীপুর সদর উপজেলার পানিচত্বর এলাকার বাসিন্দা। তার স্বামী মঈন উদ্দিন মাতুব্বর পুলিশ সদস্য ছিলেন। ১৬ বছর আগে তার স্বামী দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মারা যান। কিছুদিন পরে তার দুই ছেলেও মারা যান। স্বামী ও দুই ছেলের মৃত্যুর পর বৃদ্ধা রাশিদার বরিশাল পুলিশ বু্যুরো ইনভেস্টিকেশন (পিবিআই) অফিসে চাকরি হয়। সেই সুবাদে রাশিদা উজিরপুর উপজেলার ইচলাদী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আবুল কালাম নামের এক ব্যক্তির ভাড়া বাসায় তার কন্যাকে নিয়ে বসবাস করেন। বৃদ্ধা রাশিদা আরো জানান, প্রায় এক মাস আগে ওই ভাড়া বাসা থেকে স্থানীয় বখাটে শুক্কুর আলী, আনিচুর রহমানসহ কয়েকজন বখাটে তার মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে উজিরপুর মডেল থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ গত ২৪ দিন আগে তার মেয়েকে উদ্ধার করে। পরবর্তী সময়ে পুলিশ সংবাদ দিয়ে তাকে থানায় ডেকে মেয়েকে বুঝিয়ে দেন। এ সময় বৃদ্ধা রাশিদা থানার ওসি শিশির কুমার পালকে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেন। কিন্তু ওসি তাকে বলে আপনার মেয়ে পেয়েছেন আপনি চলে যান বিচার হয়ে গেছে।

এমন পরিস্থিতে থানা থেকে মেয়েকে নিয়ে বৃদ্ধা রাশিদা বাসার উদ্দেশে রওনা হলে পথিমধ্যে আগের অভিযুক্তরাই আবার তার মেয়েকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তখন পুনরায় থানায় আসলে ওসির কথানুযায়ী অভিযোগ লিখে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও কোনো সুফল না পেয়ে পরের দিন নতুন করে আবার একটি অভিযোগ দিলে ওসি রাশিদার সামনে বসেই অভিযোগ ছিঁড়ে ফেলে দেন।

বৃদ্ধা রাশিদা বেগম বলেন, আমি তিনবার অভিযোগ লিখে ওসির কাছে দিয়েছি। প্রত্যেকবারই ওসি আমার সামনে বসেই অভিযোগ ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে বলেন, এসব নিয়ে সময় নষ্ট করা সম্ভব না। অপরদিকে মেয়েকে ছিনিয়ে নেওয়া ওইসব বখাটেদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেওয়ার অভিযুক্তদের স্বজনরা তার (রাশিদা) ভাড়া বাসায় তালা ঝুলিয়ে দেয়।

পরে উপায় না পেয়ে অতি সম্প্রতি বৃদ্ধা রাশিদা বেগম বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে পুরো ঘটনাটি জানিয়ে ওসি শিশির কুমার পালের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক রেঞ্জ ডিআইজি উজিরপুর থানার ওসি শিশির কুমারকে ফোন করে বৃদ্ধা রাশিদাকে আইনি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তার ভাড়া বাসা থেকে মালামাল উদ্ধারের জন্য নির্দেশ দেন।

রাশিদা আরো বলেন, ডিআইজি স্যারের কাছে যাওয়ার পরে ওসি বুধবার সন্ধ্যায় আমাকে থানায় ডেকে আনেন। সন্ধ্যায় আমি থানায় ওসির সঙ্গে দেখা করতে তার রুমে গেলে তিনি বলেন, আপনি একটু পরে আসেন, আপাতত থানার বাহিরে চায়ের দোকানে গিয়ে বসেন। তখন থানার সামনের চায়ের দোকানে গিয়ে বসার পর পুলিশ সদস্য জাহিদ রাশিদাকে নির্যাতন করে।

রাশিদা বেগমের দাবি, রেঞ্জ ডিআইজির কাছে ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় থানার ওসি শিশির কুমার পাল পরিকল্পিতভাবে পুলিশ সদস্য জাহিদকে দিয়ে তাকে নির্যাতন ও মারধর করেছেন।

এ বৃদ্ধাকে মারধরের সম্পর্কে ওসি শিশির কুমার পাল জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বরিশাল পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তিনি শুনেছেন তদন্ত প্রতিবেদন মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

"