পর্ব-১

কুমিল্লা সিটির ময়লাখোলার দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

মারুফ আহমেদ, কুমিল্লা

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ঝাঁকুনীপাড়া গ্রামে এক সময়ে এখানে ছিল লাশ কাটা ঘর। অনেকটা নিচু এলাকা হওয়ায় বৃষ্টির সময় ময়লা আবর্জনায় হাঁটা-চলা দায় ছিল মানুষের। লোকবসতিও ছিল অনেক কম। পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ চালু হওয়ার পর এখানকার লাশকাটা ঘরটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ৯০’র দশকের মাঝামাঝি তৎকালীন পৌরসভার ময়লা আবর্জনা ফেলা শুরু হয় ঝাঁকুনীপাড়ার লাশকাটা ঘরে আশপাশে যা স্থানীয়ভাবে ‘ময়লাখোলা’ নামে পরিচিত হয়। আর সিটি করপোরেশনের কাগজে কলমে যার নাম হয় ‘স্যানেটারি ল্যান্ড ফিল্ড’। শুরুতে ময়লা আবর্জনার পরিমাণ কম ছিল। ২০১১ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর সীমানা এবং জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। ফলে মানুষের ব্যবহৃত উচ্ছিষ্টের পরিমাণও বাড়ে। আর এজন্য পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে ময়লা আবর্জনার পরিমাণও। এতে দিন যত বাড়ছে ততই অতিরিক্ত ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধে অসহনীয় হয়ে উঠেছে ওই এলাকায় মানুষের বসবাস।

জেলার আদর্শ সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন জগন্নাথপুর। এই ইউনিয়নের একটি গ্রাম ঝাঁকুনীপাড়া। গ্রামটিতে লোকসংখ্যা প্রায় ২ হাজার। এর আশপাশে রয়েছে দৌলতপুর, বাজগড্ডা, জগন্নাথপুর, খামার কৃষ্ণপুর এলাকা। সব গ্রামের লোকসংখ্যা প্রায় হাজার দশেক। সরেজমিন ময়লাখোলা এলাকা ঘুরে ও এর আশপাশের গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন নগরীর ২৭টি ওয়ার্ড থেকে শত শত টন ময়লা আবর্জনা এখানে ফেলছে নগর কর্তৃপক্ষ। সীমানা প্রাচীর না থাকায় এবং দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সামান্য বাতাসে চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে উল্লিখিত গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় চরম ব্যাঘাত ঘটে। স্থানীয় একাধিক তরুণ যুবক জানান, দুর্গন্ধ থেকে কোনোভাবেই এলাকাবাসীর মুক্তি নেই। যখনই ডাম্পিং প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। দুর্গন্ধের কারণে খাওয়া-দাওয়া করতেও পারছেন না স্থানীয়রা। বমি, পেটের পীড়া, খোসপাঁচড়া, মাথা ঘুরানো, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয়রা। বৃষ্টিতে আশপাশের জলাশয়, রাস্তাঘাটে ময়লা আবর্জনার পানি ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়রা অনেক প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও মিছিল করেছেন। ময়লা আবর্জনাবাহী গাড়ি আটকে দিয়েছেন। এ নিয়ে অনেক সময় হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।

ময়লাখোলার পাশে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা রমজান, আসলাম, কালুসহ একাধিক লোকের সঙ্গে। তারা জানায়, ময়লা বন্ধে এলাকার লোকজন বিক্ষোভ করলে মেয়রের পক্ষের লোকজন তাদের মারধর করে। ময়লাখোলার পাস দিয়েই চলে গেছে জেলার একমাত্র স্থলবন্দর বিবির বাজারের সড়কটি। প্রতিদিন এই বন্দর দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেই যাতায়াত করেন অনেকেই। একইভাবে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান যাচ্ছে ভারতে। বিবিরবাজার বন্দরে কথা হয় নগরীর শাকতলা এলাকার হোসেন, শাসনগাছার রকিবসহ বেশ ক’জনের সঙ্গে। তারা বলেন, ময়লাখোলা এলাকার এক দেড় মাইল দূরেও দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। সরেজমিন ঘুরে আরো দেখা গেছে, ময়লাখোলার মূল প্রবেশ মুখে রয়েছে বিশাল আবর্জনার উঁচু স্তূপ। প্রায় ১০.৫৮ একর আয়তনের ময়লাখোলার ভেতর আবর্জনা ফেলার জন্য তিনটি বিশাল আকারের পুকুর থাকলে অভিযোগ রয়েছে সেগুলো অনেকটা খালি পড়ে রয়েছে। যদিও এসব পুকুরে ময়লা আবর্জনা ফেলে সেটা ভরাট করার কথা। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মোঃ নুরুল্লাহ প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, এই ময়লা আবর্জনার বিকল্প কোনো কাজে ব্যবহারের বিষয়ে জাপানি উন্নয়ন সংস্থার (জাইকা) একটি প্রতিনিধিদল বিগত বছর দুয়েক আগে সরেজমিন স্যানেটারি ল্যান্ডফিল্ড বা ময়লাখোলা এলাকা পরিদর্শনে আসেন। এ সময় বর্জ্য আবর্জনা থেকে কম্পোজ সার, বিদ্যুৎ, গ্যাস তৈরির সম্ভাব্যতা নিয়েও আলোচনা হয়। তবে এখনো সে ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

"