ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়মের প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ঢাবি প্রতবেদক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের আট নেতার ছাত্রত্বের বৈধতা এবং সম্প্রতি রোকেয়া হলের নিয়োগ-বাণিজ্যের প্রশ্নে আন্দোলন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এসব ঘটনায় কয়েক দিন ধরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলে সরগরম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এতে ভিসি, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন ও রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

গত ৮ সেপ্টেম্বর রোববার দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় দৈনিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, হল সংসদের আট নেতাসহ ৩৪ জন শিক্ষার্থীর অবৈধ ছাত্রত্ব নিয়ে একটি প্রতিবেদনে ছাপা হয়। এতে দেখা যায়, অভিযুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদের আট নেতাসহ সবাই ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ায় চলতি বছরের ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের কয়েক দিন আগে তারা ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের একটি সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হন।

ভর্তির নীতিমালা অনুযায়ী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই কেবল ওই কোর্সে ভর্তি হওয়া গেলেও তাদের কেউই তাতে অংশ নেননি। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের বিভিন্ন সম্পাদক ও সদস্য পদে মোট আটজন নির্বাচনে অংশ নেন, বিজয়ী হন সাতজন। হল সংসদের ভিপি পদে অংশ নেন দুজন। এর মধ্যে একজন নির্বাচিত হন এবং অন্যজন পরাজিত হন। তবে অপরজন ছিলেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য। এ ছাড়া তাদের ভর্তি প্রক্রিয়াই উপাচার্য কর্তৃক ‘বিশেষ চিরকুট’ প্রদানের অভিযোগও করা হয় প্রতিবেদনে।

দুর্নীতি ও অনিয়ম করে ‘বিশেষ চিরকুট’-এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত ডাকসু ও হল সংসদের আট নেতারা হলেন ডাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক মো. আরিফ ইবনে আলী, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী, ক্রীড়া সম্পাদক শাকিল আহমেদ তানভীর, ডাকসুর সদস্য মো. রাকিবুল হাসান, নজরুল ইসলাম, মাহমুদুল হাসান ও নিপু ইসলাম। এ ছাড়া এই তালিকায় রয়েছেন এফ রহমান হলের ভিপি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলীম খান।

এ বিষয়ে জানতে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন শিবলি রুবায়েতুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘মিটিংয়ে ব্যস্ত’ আছেন বলে জানান।

উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামান ‘চিরকুট-সংক্রান্ত’ বিষয়টিকে ‘উদ্ভট ও হাস্যকর’ বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত কিছুই আমি জানি না। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিনকে এ বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য বলেছি।’

এদিকে চলতি মাসের ৩ সেপ্টেম্বর তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল সংসদ ও হল ছাত্রলীগের নেতাদের বিরুদ্ধে ২১ লাখ টাকা নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ করেন শ্রবণা শফিক দীপ্তি, সায়েদা আফরিন শাফিসহ রোকেয়া হলের বেশ কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এই অভিযোগ করেন। তাদের অভিযোগ, হল সংসদের ভিপি ইসরাত জাহান তন্বী হলের কর্মচারী কামাল উদ্দিনের ছেলে কামরুজ্জামানকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য আট লাখ, জি এস সায়মা আক্তার প্রমি হলের মালী বাবুল চৌহানের ছেলে পলাশ চৌহানকে মালী পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য পাঁচ লাখ, রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক বি এম লিপি আক্তার ও সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী দিশা সমন্বিতভাবে আলমগীর নামের একজনকে প্রহরী পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য আট লাখ টাকার লেনদেন করেন।

হল সংসদের এজিএস ফাল্গুনী তন্বী কোনো ভাগ না পাওয়ায় তার মাধ্যমেই এই তথ্য ফাঁস হয়েছে বলে জানান অভিযোগকারীরা। হলের এক কর্মচারী ও এজিএস ফাল্গুনীর মধ্যকার কয়েকটি অডিও কল রেকর্ডের ক্লিপ তাদের কাছে রয়েছে বলেও সাংবাদিকদের জানান তারা। তবে বিষয়টি জানানো হলে অস্বীকার করেন হল সংসদের ভিপি-জিএস। পরে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ সেপ্টেম্বর বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের সাবেক প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. বেগম আকতার কামালকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. লিটন কুমার সাহাকে সদস্য-সচিব ও রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষক মনিরা বেগমকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়। কমিটিকে ৫ সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য অনুরোধ করা হয়।

এই দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত রোববার রাত ৮টার দিকে মশালসহকারে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে আলোর মিছিল’ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। এতে অংশ নেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টসহ কয়েকটি বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের ঢাবি শাখার শতাধিক নেতাকর্মী।

মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো প্রদক্ষিণ শেষে রোকেয়া হলের সামনে এসে শেষ হয়। মিছিল শেষে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক রাগীব নাঈমের সঞ্চালনায় এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে অনৈতিকভাবে ‘চিরকুটের মাধ্যমে’ ছাত্র ভর্তি করানোর অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন শিবলী রুবায়েতকে বহিষ্কারের দাবি জানান বক্তারা।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ঢাবি শাখার সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, ছাত্রলীগের যাদের ছাত্রত্ব ছিল নাÑ এ ধরনের ৩৪ জনকে উপাচার্য ও ডিন চিরকুটের মাধ্যমে ভর্তি করিয়েছেন।

একজন শিক্ষক, যার নৈতিক স্থলন হয়েছে, সে কখনো শিক্ষক হতে পারে না। আমরা ভিসি, ডিন ও রোকেয়া হলের প্রোভোস্টকে সব কার্যক্রম থেকে বহিষ্কারের দাবি জানাচ্ছি।

এ সময় রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী ও নিয়োগ-বাণিজ্য গণমাধ্যমে প্রকাশকারী শ্রবণা শফিক দীপ্তি বলেন, রোকেয়া হলের দুর্নীতির কথা বেরিয়ে এসেছে হল সংসদের এজিএস ফাল্গুনী তন্বীর মাধ্যমে।

অনৈতিকভাবে ‘চিরকুটের মাধ্যমে’ ছাত্র ভর্তি করানো প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাবি শাখার সভাপতি আবু রায়হান খান ঢাবি ভিসিকে উদ্দেশ করে বলেন, ভিসির কাছে আমি প্রশ্ন রাখতে চাই, আপনি কি চিরকুটের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন? না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এমন কাজ কেমনে করলেন আপনি?

এর আগে একই দিনদুপুর ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে একই দাবিতে মানববন্ধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এতে নৈতিক স্খলনের কারণ দেখিয়ে এক মানববন্ধন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী এই দুজনের পদত্যাগ দাবি করেন তারা।

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা সর্বমোট তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো : ১. জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তি হওয়া ছাত্রদের বহিষ্কার করতে হবে।

৩. ডাকসুর পদগুলোকে শূন্য করে আবার উপনির্বাচন দিতে হবে? এবং ৪. ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নৈতিক স্খলনের দায়ে ব্যবসায়ী শিক্ষা অনুষদের ডিন, চিরকুটের মাধ্যমে অবৈধভাবে ভর্তি করানোর দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও ডাকসু সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন শিবলী রুবায়েতকে বহিষ্কার করতে হবে। মানববন্ধনে অংশ নেন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মীরা।

"