এখনই তিস্তায় হাঁটুপানি

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

লালমনিরহাট প্রতিনিধি

মাত্র মাসখানিক আগেও বর্ষা মৌসুমে তিস্তার দুই কূল ছাপিয়ে প্লাবিত হয়ে নদীর অববাহিকার বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। আর বর্ষা শেষে শরৎকালেই বাংলাদেশ অংশে তিস্তা নদী যেন মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এই বিপরীত চিত্র দেখা গেছে এই নদীতে। ফলে লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার ১২৫ কিলোমিটার তিস্তার অববাহিকায় জীবনযাত্রা, জীববৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে পড়েছে। দেশের অন্যতম সেচ প্রকল্প লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার তিস্তা ব্যারাজ অকার্যকর হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

তিস্তা নদীতে দিনভর মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলে ও খেয়াঘাটের মাঝিরা আজ কর্মহীন হতে বসেছে। মাত্র কিছু দিনেই চিরচেনা প্রমত্তা তিস্তা ঢেউহীন শান্ত কবিতার ছোট নদীতে পরিণত হয়েছে। পানির অভাবে তিস্তা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। হারিয়ে বসেছে জীববৈচিত্র্য।

তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত তিস্তা রেল সেতু, তিস্তা সড়ক সেতু ও গংগাচড়া শেখ হাসিনা সেতু দাঁড়িয়ে রয়েছে ধু-ধু বালুচরের পানিশূন্য তিস্তার ওপর। ব্রিজ থাকলেও পায়ে হেঁটেই পাড় হচ্ছেন অনেকেই। আর ব্রিজের নিচে রয়েছে বিস্তৃীর্ণ বালুকণা। বর্ষা শেষ হতে না হতেই তিস্তার বুকে জেগে উঠা চরের ভুট্টা, আলুসহ বিভিন্ন সবজি চাষাবাদ করছেন চাষিরা। তবে পানিশূন্য তিস্তা চরে সেচ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন তারা।

তিস্তা পাড়ের জেলে সাইদুল ইসলাম জানান, তিস্তা নদীতে মাছ ধরে চলে তার তিন সন্তানের লেখাপড়া ও সংসার খরচ। একমাত্র গ্রীষ্মকালে তিস্তা পানিশূন্য হলে অন্য পেশায় চলে যেতেন তিনি। এ বছর বর্ষা শেষ হতে না হতেই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে তিস্তা। ফলে হেমন্তকাল আসার আগেই মাছ ধরা বন্ধ হয়ে পড়বে। তাই সংসার সচল রাখা নিয়ে বড়ই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন এই জেলে।

নৌকার মাঝি দেলোয়ার হোসেন জানান, বর্ষাকালে খেয়া পাড়ে ও জেলেদের নৌকা ভাড়া দিয়ে দৈনিক ৫/৬শত টাকা আয় হতো। কিন্তু এখন পানি কমে যাওয়ায় তিস্তায় নৌকা চলাচল করতে পারে না। তাই তিস্তা ব্যারাজে বেড়াতে আসা পর্যটকদের নৌভ্রমণের আনন্দ দিয়ে দিনভর ২/৩শত টাকা আয় করে কোনো রকম সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

তিস্তা পাড়ের কৃষক রশিদুল ইসলাম, আকবর আলী ও কলিম মামুদ বলেন, বর্ষাকালে প্রচুর পানি ছেড়ে দেওয়ায় সৃষ্ট বন্যায় ফসলহানিসহ ঘরবাড়ি হারাতে হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষদের। আবার শুষ্ক মৌসুমে ফসল রক্ষায় পানির প্রয়োজন হলেও তিস্তায় পানি দেয় না ভারত। এ বছর শরৎকালেই পানিশূন্য তিস্তা পাড়ের চরাঞ্চলে চাষাবাদ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদী শাসন ও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা না থাকায় তিস্তা নদী কৃষকের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে।

লালমনিরাট সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়নের চর খাটামারী তিস্তা পাড়ের শিক্ষার্থী মনোয়ারা বেগম মনি জানান, জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা চাই। সেসঙ্গে তিস্তা নদী শাসন করে তিস্তার পানির বহুমুখী ব্যবহারের ব্যবস্থা করে দেশের উন্নয়নে এ অবহেলিত অঞ্চলকে কাজে লাগাতে হবে। এজন্য তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের ওপর এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করছে।

দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, বেশ কিছু দিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় শরৎকালেই কমেছে তিস্তার পানি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষাকাল ধরা হয়। সেই অনুযায়ী এ অঞ্চলে বা ভারতের সিকিমে বৃষ্টিপাত হলে তিস্তায় পানি বাড়তে পারে। তবে বৃষ্টিপাত না হলে সেচ প্রকল্প সচল রাখা সমস্যা হবে বলেও মনে করেন তিনি।

ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর নীলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তিস্তা নদী। যা লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী বন্দর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশে যায়। তিস্তা নদী দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার হলেও বাংলাদেশ অংশে রয়েছে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার।

তিস্তার পানি প্রবাহ এককভাবে ব্যবহার করতে প্রতিবেশী দেশ ভারত গজলডোবায় একটি বাঁধ নির্মাণ করে। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পরই বাংলাদেশে পানি দেয়া হয়। আবার বর্ষাকালে বন্যার অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশে বন্যার সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে শুষ্ক মৌসুমে পানির ব্যাপক প্রয়োজন দেখা দিলেও মিলে না পানি। এভাবে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দীর্ঘ দিনের দাবিটিও পূরণ হয়নি তিস্তা পাড়ে।

 

"