বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী সংরক্ষণ!

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

মানুষের নানা কার্যকলাপের ফলে দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজন অববাহিকায় অনেক প্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে। পেরুতে একটি আশ্রয়কেন্দ্র এমন অনেক প্রাণীর সুরক্ষার উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে সেই পথ সমস্যায় ভরা। ইকিটোস যেতে হলে কোনো পাকা রাস্তা নেই। বিমান অথবা নৌকাই ভরসা। পেরুর অ্যামাজন বনাঞ্চলের মাঝে এই শহরের জনসংখ্যা ৪ লাখ। নিয়ম অনুযায়ী জঙ্গলের বাসিন্দারা একমাত্র নিজস্ব প্রয়োজন মেটাতে শিকার করতে পারেন। পেরুতে জীবন্ত বা মৃত বন্য প্রাণী নিয়ে ব্যবসা নীতিগতভাবে নিষিদ্ধ।

তা সত্ত্বেও বেলেন শহরের কুখ্যাত হাটে সবকিছুই কেনাবেচা চলে বিলুপ্ত প্রায় পশুর মাংস। প্রাণী সংরক্ষণবিদ গুডরুন স্প্যারার বলেন, এখানে ফলমূল, শাকসবজি রয়েছে। কিছুকাল আগে আমি এক সাবেক প্রাণী ব্যবসায়ীকে বলেছিলাম, অবশেষে এবার বেআইনি প্রাণী ব্যবসা কিছুটা কমবে। তিনি বলেছিলেন, এখন আর প্রকাশ্যে প্রাণী কেনাবেচা চলে না, বায়না এলে তবেই প্রাণী জোগাড় করে গোপনে বাসায় লুকিয়ে রাখা হয়।

গুডরুন স্প্যারার ৩০ বছর ধরে ইকিটোসে বসবাস করছেন। তিনি বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের একটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। সপ্তাহে দুবার তিনি বেলেনের হাটে প্রাণীদের জন্য ফলমূল ও শাকসবজি কেনেন। ইকিটোসের আশপাশের জঙ্গল ধীরে ধীরে খালি হয়ে যাচ্ছে। প্রাণী শিকার বাড়ছে। গুডরুন বাজারের দৃশ্যের বর্ণনা করে বলেন, টেবিলের ওপর ছোট কেইমান পড়ে রয়েছে। খুবই ছোট। আগেই মারা গেছে। মাত্র দুই থেকে তিন মাস বয়স হয়েছিল। মানুষ যে এমন প্রাণী কেনে, সেটা সত্যি দুঃখজনক।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বংশবৃদ্ধির আগেই এমন সব প্রাণী হত্যা করা হয়, যা বিভিন্ন প্রাণীর বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ। গুডরুন স্প্যারার বলেন, ধূসর রঙের এই মাংস ঠিক কোনো প্রাণীর, তা আমি জানি না। জানতে পারলাম এর নাম সাতচাভাকা। খুবই খারাপ বিষয়, কারণ এই প্রজাতির টাপির লুপ্তপ্রায় হিসেবে পরিচিত।

বাজারে এমন একটি প্রাণী দেখা গেল, যেটিকে সম্ভবত খুব কম বয়সে মারা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, টাপির বেশ বড় প্রাণী। এমন প্রাণীর ওজন ৩০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। সমস্যা হলো, বংশবৃদ্ধির পর্যায়ে পৌঁছতে ছয় থেকে সাত বছর পর্যন্ত সময় লাগে।

হাতে সময় কম, প্রাণীরা খোরাকের জন্য অপেক্ষা করছে। ইকিতোসের পশ্চিম বন্দরে নৌকা এসেছে। গুডরুনকে পানির ওপর দিয়ে কিছুটা পথ যেতে হয়। রিও নানে থেকে পাদ্রে কোচা পর্যন্ত। সেখানেই প্রাণীদের আশ্রয়কেন্দ্র। প্রাণীদের স্বার্থে জঙ্গলের মধ্যেই সেটি গড়ে তোলা হয়েছে।

২৪ বছর আগে প্রজাপতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছিল। আজ সেখানে পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীও থাকে। গুডরুন সেই সব প্রাণীর আশ্রয় দেন।

গত বছর সাদা গন্ডার প্রজাতির সর্বশেষ পুরুষ সদস্যটি মারা যায় সুদানে। বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ বলছেন আইভিএফ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গন্ডারের এই প্রজাতিকে হয়তো টিকিয়ে রাখা যেতে পারে। কেউ আবার বলছেন প্রাণীটিকে টিকিয়ে রাখারা জন্য এ প্রযুক্তি ব্যবহারের সময়ও আর হাতে নেই। জাগুয়ারের মতো অনেক লুপ্তপ্রায় প্রাণীও রয়েছে। শিশুশাবক হিসেবে গুডরুন সেটিকে হাতে পেয়েছিলেন। বেআইনি প্রাণী পাচারের সময় সেটিকে উদ্ধার করা হয়েছিল। তিনি বলেন, কাঁটাতারে মোড়া কাঠের বাক্সে এই শাবকটিকে কেউ আমার এখানে ফেলে গিয়েছিল। সেই ব্যক্তি আদিবাসীদের সঙ্গে ব্যবসা করে এবং নানারকম পণ্য বিক্রি করে। সে এই প্রাণীটি বিক্রি করতে পারেনি। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সে প্রাণীটিকে বাক্সবন্দি রেখেছিল। শাবকটি আর দাঁড়াতেই পারছিল না।

জাগুয়ারদের প্রায় ৭০ শতাংশ রেড মিট বা লাল মাংসের প্রয়োজন হয়। তা না হলে তাদের কিডনির ক্ষতি হয়। পেদ্রো বেলোর ওজন এখন ৯৪ কিলোগ্রাম। প্রতি ৩ সপ্তাহ অন্তর সে একটা আস্ত গরু খায়। গুডরুন স্প্যারার বলেন, বিশেষ করে বিচরণক্ষেত্র হারিয়ে যাওয়ার কারণে জাগুয়াররা বিলুপ্তির পথে চলেছে। এই প্রাণী একাই থাকে। প্রত্যেক জাগুয়ার কমপক্ষে ৫০ বর্গকিলোমিটার নিজস্ব ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করে।

হুমকির মুখে রয়েছে টেপির জাতের পশু। বেলেনের হাটে টেপিরের মাংস বিক্রি হয়। গুডরুন স্প্যারার বলেন, টেপির স্নান করতে খুব ভালোবাসে। মলমূত্র ত্যাগের জন্যও পানির ওপর তারা খুব নির্ভরশীল। তুষার যুগেও তারা টিকে গিয়েছিল। অথচ মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে মানুষ তাদের লুপ্তপ্রায় করে তুলেছে। খবর ডেয়েসে ভেলের।

 

"