মুরগির বিষ্ঠায় মাছ চাষে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

‘চাষের মাছে সব সময়ই কেমন যেন একটা গন্ধ থাকে’

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ হলেও এখনো নিশ্চিত হয়নি এর নিরাপদ চাষাবাদ। ঘের ও পুকুরে মাছের খাদ্য হিসেবে দেওয়া হচ্ছে মুরগির বিষ্ঠা। যাতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, মুরগির বিষ্ঠায় অনেক জীবাণুু থাকায় মাছের রোগবালাই বেড়ে যায়। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকার এ বিষয়ে সচেতন আছে। কয়েক একরের ঘের, যেখানে চাষ হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। আর সেই ঘেরে তৈরি করা হয়েছে মুরগির খামার।

বাণিজ্যিক ও সমন্বিত খামারের মাছের প্রধান খাদ্য হচ্ছে মুরগির বিষ্ঠা। ঢাকার ধামরাই, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন মাছের খামারের এখনো প্রধান খাদ্য এটি। বিভিন্ন মুরগির খামার থেকে সংগ্রহ করে ফেলা হয় পুকুরে, ঘেরে।

মৎস্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে উৎপাদিত মাছে রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এছাড়া মুরগির বিষ্ঠায় অনেক জীবাণু থাকায় মাছের রোগবালাই বেড়ে যায়। বিশেষ করে ৯০ এর দশকে চিংড়িতে যে মড়ক দেখা দিয়েছিল তার বড় কারণও ছিল মুরগির বিষ্ঠা।

ঢাকার খিলগাঁওয়ের একটি মাছের বাজার ঘুরে দেখা যায়, রুই, কাতল, মৃগেল, কৈ, পাঙ্গাশসহ বিভিন্ন ধরনের নানা সাইজের মাছ নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। বিক্রেতাদের ভাষায় যার কোনোটি নদীর মাছ আবার কোনোটি চাষের। এই বাজারে নিয়মিতই মাছ কেনেন রুনা বেগম।

তিনি জানান, নদীর মাছ ছাড়া অন্য কোনো মাছ তিনি কেনেন না। কিন্তু কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, নদীর মাছে যে স্বাদ, চাষের মাছে সেটা পাই না। চাষের মাছে সব সময়ই কেমন যেন একটা গন্ধ থাকে। অনেকটা ঘাসের মতো। তবে চাষের মাছ কেনেন এ রকম ক্রেতারও অভাব নেই। এর বড় একটা কারণ চাষের মাছের দাম কম।

একজন নারী ক্রেতা বলছিলেন, অনেক সময় নদীর রুই বা কাতল মাছের যে দাম চায় তার অর্ধেক দামে চাষের রুই বা কাতল মাছ কিনতে পারি। কিন্তু চাষের মাছ কিনলেও মনে সব সময়ই একটা সন্দেহ থাকে যে এই মাছ কীভাবে, কোথায় চাষ হচ্ছে, মাছকে কী খাওয়াচ্ছে, এসব মাছ খেলে আমাদের কোনো ক্ষতি হবে কি না তা নিয়ে একটা ভয় থাকে। এতে বোঝা যায় দেশে মাছ চাষ নিয়ে একটা সন্দেহ-সংশয় রয়েছে অনেকের মধ্যেই। এর যৌক্তিকতা বুঝতে মাছ চাষের জন্য বিখ্যাত শহর ময়মনসিংহের ত্রিশালে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনই এই এলাকা থেকে লাখ লাখ টাকার মাছ ব্যবসায়ীরা ঢাকায় নিয়ে যান বিক্রির জন্য। ময়মনসিংহের ত্রিশালে একটি মুরগির খামার। এই খামারের বর্জ্য ব্যবহার করা হয় পাশেই মাছের খামারে মাছের খাদ্য হিসেবে। ত্রিশালের পোড়াবাড়ি এলাকায় দেখা যায় মাছের খামারের সঙ্গে সঙ্গে মুরগির খামারও গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে দেখা যায় মুরগির খামারের বিষ্ঠা ও অন্যান্য আবর্জনা ধুয়ে নালায় ফেলছেন কয়েকজন কর্মচারী। সেসব আবর্জনা পরে নালা হয়ে চলে যায় মাছের খামারে মাছের খাদ্য হিসেবে।

খামারের একজন কর্মচারীর জানান, সাত বছর ধরেই এই মাছের খামারে মাছের খাদ্য হিসেবে মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার করেন তারা। এতে মাছের খাবারের পেছনে ব্যয় অনেকটাই কমে যায় তাদের। তবে এভাবে বিষ্ঠা ব্যবহার করে যে মাছ চাষ নিষিদ্ধ সেটা জানেন না এই খামারের কেউই।

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবু সাইদ মো. রাশেদুল হক জানান, মুরগি পালনে নানা রকম অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়। যেগুলো মুরগির বিষ্ঠার মাধ্যমে মাছের শরীরে প্রবেশ করে। এগুলো ধ্বংস হয় না। তাই এগুলো মাছের মাধ্যমে পরে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যের ক্ষতি ঘটাতে পারে। এজন্য কয়েক বছর আগেই মাছের খাবার হিসেবে মুরগির বিষ্ঠা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। কিন্তু এরপরও কেন এই পদ্ধতির ব্যবহার হচ্ছে জানতে চাইলে রাশেদুল হক বলেন, অনেকে এখনো গোপনে এটা করছে। আমরা জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। মোস্তাফিজ রাজু নামে একজন খামার মালিক বলেন, আমরা তো পটাশ কিংবা চুন ব্যবহার করি পানি ঠিক রাখার জন্য। আর ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক দরকার হলে ব্যবহার করি। কোম্পানির লোকেরা আসে তারা বলে কীভাবে কতটুকু ব্যবহার করতে হবে। অনেক সময় অন্য অভিজ্ঞ খামারিদের পরামর্শ নেই।

 

"