সুলতান সুলেমান

ছেলের মৃত্যুর আদেশদাতা যে অটোমান সম্রাট

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

তুরস্কে অটোমান সাম্রাজ্য যখন প্রতিষ্ঠিত এবং ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে; তখন ষোড়শ শতাব্দী। দশম সুলতান হিসেবে সিংহাসনে বসেন সুলতান সুলেমান খান। ১৪৯৪ সালের ৬ নভেম্বর তিনি জন্ম নেন তুরস্কে। তিনি ১৫২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বিশাল রাজ্যের দায়িত্ব নেন। সুলতান সুলেমানের শাসনামলে অটোমান সাম্রাজ্য এশিয়া ছাড়া ইউরোপ ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস

ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান বলছিলেন, রাজ কাজ পরিচালনা করার প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণতা সুলতান সুলেমানের ছিল। এ জন্য পশ্চিমারা তাকে ‘ম্যাগনিফিসেন্ট বা মহামতি’ বলতেন। আবার তুরস্কে তিনি ‘কানুনি সুলতান’ নামে পরিচিত ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক সুলতানা সুকন্যা বাশার বলেন, তিনি অসম্ভব দৃঢচেতা ছিলেন। শাসন প্রক্রিয়া এবং মনোবল নিয়ে তিনি শত্রুদের মোকাবিলা করতে পেরেছেন। সুলতান সুলেমানের সেনাবাহিনীর দ্বারা রোমান সাম্রাজ্য এবং হাঙ্গেরির পতন ঘটায়। তিনি উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়াসহ বড় বড় অঞ্চল রোমান সাম্রাজ্যের হাত থেকে দখল করে নেন। অটোমান নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিতসাগর ও পারস্য উপসাগর পর্যন্ত তাদের আধিপত্য বজায় রাখে।

অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান বলছিলেন, ইউরোপে সেসময় তার সমকক্ষ কোনো শাসক ছিলেন না। আইন প্রণয়ন, শাসন বিধি প্রণয়ন, সামরিক সাফল্য, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সব মিলিয়ে তিনি ওই সময়ের রাজন্যবর্গের মধ্যে ছিলেন অনন্য।

অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান আরো বলেন, সোলেমান সাম্রাজ্যের সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রণালি তৈরি করেছিলেন। তার উত্তরাধিকারীরা সেটা অনুসরণ করেছেন। বিশাল এলাকা তিনি আজকের ইস্তানবুল থেকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বা সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে উন্নয়ন ঘটেছিল তার সময়। তার সময়কে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবেও আখ্যা দিয়ে থাকেন ইতিহাসবিদরা। তিনি নিজে কবিতা লিখতেন। তার সময়ে নামকরা স্থপতি সিনান মিনার পাশা নির্মাণ করেছিলেন সুলেমানি মসজিদ যেটা ‘ব্লু মস্ক’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া তোপকাপি প্রাসাদে সিনান মিনার পাশার কাজ রয়েছে। সুলেমান ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কাছের মানুষদের মৃত্যুর আদেশ দেন। নিজের ছেলে মুস্তাফার মৃত্যুর আদেশদাতা তিনি। এরপর তার দ্বিতীয় ছেলে সেলিমকে আদেশ দেন আরেক ছেলে বায়েজিদের মৃত্যু কার্যকর করার জন্য। সুলতান সুলেমান সন্তানদের অসম্ভব ভালোবাসতেন এবং বিপদে একে অপরের পাশে থাকার উপদেশ দিতেন, তিনিই আবার তাদের মৃত্যুদন্ডাদেশ দেন। অনেকেই তাকে ‘ক্ষমতালিপ্সু’ মনে করেছেন।

সুলতানা সুকন্যা বাশার বলেন, ‘ক্ষমতাসীনরা জীবনকালে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে চান না। একজন সুলতান যখন দেখবেন তার ছেলের জনপ্রিয়তা তার চেয়ে বেশি এবং তার কানে যদি খবর আসতে থাকে সেই ছেলে বিদ্রোহ করতে পারেন; তাহলে তখন সেই ব্যক্তি কিন্তু বাবা হিসেবে সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি সাম্রাজ্যের জন্য তখন একজন সুলতান হিসেবে সিদ্ধান্ত নেন। সেটিকে তিনি দেশদ্রোহিতার শামিল মনে করেছেন। যেটা হয়েছে মুস্তাফার ক্ষেত্রে।

তবে অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান বলছিলেন, উত্তরাধিকার নিয়ে যাতে কোনো সমস্যা তৈরি না হয়; সেজন্য সুলতান সুলেমানের আগেই একটি আইন তৈরি করা ছিল। সাম্রাজ্য যাতে হুমকির মুখে না পড়ে বা স্থায়িত্ব কম না হয়; সে কারণে ‘ভ্রাতৃহত্যা আইন’ নামে একটি আইন করা হয়েছিল। এ আইনে শুধু ‘প্রতিদ্বন্দ্বী ভাইদের ও সন্তানদের হত্যা করা যেত।’

‘এই আইনটি একটি অমানবিক আইন ছিল। যেটার চর্চা সুলতান সুলেমান নিজেও করেছেন তার সাম্রাজ্যকে এবং তার ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য। যেটা ইতিহাসে আছে এবং তার চরিত্রে এটা একটা অন্ধকার দিক। যেটা তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক,’ বলছিলেন তিনি।

দাসীকে মুক্ত করে স্বাধীন নারী হিসেবে বিয়ে করার নিয়ম ছিল, সুলেমান নিজে একজন দাসীকে মুক্ত করে বিয়ে করেন, যার নাম ছিল হুররাম। ছিদ্দিকুর রহমান খান বলছিলেন, ‘রাজনীতিতে হুররাম এবং সুলেমানের মায়ের ভূমিকা ছিল। এবং সুলেমান নিজেই সেটা করে দিয়েছিলেন। তবে ইউরোপীয় গবেষণায় হেরেম সম্পর্কে চূড়ান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখতে পাওয়া যায়।’

সুলেমান দীর্ঘ ৪৬ বছর রাজত্ব করেন। ১৫৬৬ সালের হাঙ্গেরি অভিযানকালে ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান। সেনাবাহিনীর মনোবল দুর্বল হয়ে যাবে- এ কারণে তথ্য গোপন রাখা হয়। সুলতান সুলেমান মারা যাওয়ার পর তার ছেলে দ্বিতীয় সেলিম অটোমান সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন।

 

"