ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে কালুরঘাট সেতু

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রামের ৯০ বছরের পুরোনো কালুরঘাট সেতু। দিন যতই গড়াচ্ছে কালুরঘাট সেতু নিয়ে শঙ্কা ততই বাড়ছে। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে ট্রেনসহ হাজার হাজার ভারী যানবাহন। অথচ ২০ বছর আগেই সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। গত ২০ বছরে সেতুটির পেছনে ব্যয় হয়েছে ৪০ কোটির বেশি টাকা। এখন জোড়াতালি দিয়েই চলছে সেতুটি। ভেঙে পড়তে পারে যেকোনো মুহূর্তে। কালুরঘাট সেতু নির্মাণের জন্য বিভিন্ন সরকারের কাছে একাধিকবার দাবি উঠেছে। শেষ পর্যন্ত এ সেতুর জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য মাইনুদ্দিন খান বাদল নিজের দলবদল এমনকি পদত্যাগেরও হুমকি দিয়েছেন। তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদ অবশ্য বলেছেন, এ সরকারের আমলে কালুরঘাট সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন।

কালুরঘাট সেতুর মতো একই কর্মকান্ড হয়েছে কর্ণফুলী সেতু নিয়েও। শেষ পর্যন্ত চীনের সহায়তায় এ সেতু নির্মাণ হলে সব কিছুর সমাপ্তি ঘটে।

এদিকে কালুরঘাট সেতু নির্মাণ নিয়ে ‘কর্ণফুলী নদীর ওপর রেল কাম সড়ক সেতু প্রকল্প’ নামের একটি প্রকল্প এরই মধ্যে একনেকে উপস্থাপিত হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীর ওপর এই রেল ও সড়ক সেতু ভবিষ্যতে চীন, ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে সংযুক্ত করে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ

বিশেষ হিসেবে কাজ করবে। এটি নির্মাণে ব্যয় হবে ১ হাজার ১৬৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা। কিন্তু কবে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শুরু হবে। আর হলে দীর্ঘসূত্রতায় পড়বে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে। তার আগেই কালুরঘাট সেতু বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। কারণ বর্তমানে সেতুটির অবস্থা যে পর্যায়ে গেছে তাতে যেকোনো মুহূর্তে এটি ভেঙে পড়তে পারে। এটি আর ভার সইতে পারছে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯১৪ সালের দিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কর্ণফুলী নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ব্রিটিশ সরকার ১৯৩০ সালে বিদেশ থেকে ভারী লোহার পাত, পিলার আর কাঠ দিয়ে নির্মাণ করে সেতুটি। কালু মাঝির নাম দিয়ে এর নামকরণ কালুরঘাট সেতু। চট্টগ্রামের সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ট্রেন যোগাযোগ সহজ করার জন্য মূলত সেতুটি নির্মিত হয়। পরে ১৯৫৮ সালে যানবাহন চলাচলের উপযুক্ত করে সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। যখন রেল চলে তখন সেতুতে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। প্রায় ২ হাজার ১০০ ফুট দীর্ঘ এ সেতুতে রয়েছে ৬টি বিশালাকৃতির ইটের পিলার, ১২টি স্টিল পিলার, ১৯টি স্প্যান। কালুরঘাট সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির মুখে কর্ণফুলী সেতু নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এ সেতুতে ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের বিশাল অংশের কোনো কাজে না লাগার কারণে কালুরঘাট সেতুর চাহিদা অনেকটা আগের মতো রয়েছে। এখনো দক্ষিণ চট্টগ্রামের বড় অংশের অন্যতম ভরসা এই একমুখী রেল সেতুটি। একমুখী চলাচলের কারণে দুই পাশে যানজট লেগেই থাকে। প্রতিদিন সেতুটির ওপর যে পরিমাণ চাপ পড়ে তাতে কখন এটি ভেফু পড়ে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। প্রতি বছর এ সেতু মেরামতের নামে বরাদ্দ হচ্ছে বড় অংকের টাকা। সেতুর ওপরের কার্পেটিং অনেক স্থানে উঠে গেছে। কয়েকটি স্থানে লোহার পাতে মরিচা ধরেছে। নিচের পিলারগুলোর বয়স এখন প্রায় ৯০ বছর। সাধারণত সেতুর লোহার পিলার ৬০ থেকে ৭০ বছর ব্যবহার করার পর বিষয়টি বিশেষজ্ঞ মহলের নজরে থাকলেও কালুরঘাট সেতুর পিলারের বয়স এখন ৯০ বছরের কাছাকছি।

রেল সূত্রে জানা গেছে, গত ২০০১ সালে এ সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এক পর্যায়ে এটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০০৪ সালে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি সংস্কার করা হয়। পানির ভেতরের যে অংশের ওপর পুরো সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে তার অবস্থা কি রকম আছে তার খবর কেউ রাখে না। ক’বছর আগে বোয়ালখালির সাকিরাপুল সেতু ভেঙে তেলের ট্যাংকার নিচে পড়ে যায়। পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়ে। যদি কোনো কারণে কালুরঘাট সেতু ভেফু তেলের ট্যাংকার নিচে পড়ে যায় তাহলে চট্টগ্রাম শহরের ওয়াসার পানি সরবরাহও বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ কালুরঘাট সেতুটি এমন স্থানে রয়েছে যেখান থেকে মিঠা পানির উৎসস্থল হালদা শুরু। আর হালদা থেকে পানি নিয়ে ওয়াসা পরিশোধনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে সরবরাহ করে। তাছাড়া হালদা হচ্ছে প্রাকৃতিক মাছের প্রজনন কেন্দ্র। মূল্যবান সম্পদ বলে খ্যাত হালদাও এখন কালুরঘাট সেতুর কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, কালুরঘাট সেতুর ওপর দিয়ে বেশি ওজনের যান চলাচল নিষেধ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা মানা হয় না। কিন্তু যেসব ট্যাংকার এ সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করে তার সম্মিলিত ওজনও ৮-১০ টনেরও বেশি। ফলে কালুরঘাট সেতুতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যার পরিণাম হবে ভয়াবহ।

"