উপকূলে কেওড়া ফলে খুলতে পারে ভাগ্য

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

ইমরান হোসাইন, পাথরঘাটা (বরগুনা)

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার পূর্বে বিষখালী ও পশ্চিমে বলেশ্বর নদী। দুই নদী ও সাগরের মোহনায় গড়ে উঠছে হরিণঘাটা ও লালদিয়া বন। সুন্দরবনসংলগ্ন হরিণঘাটার মধ্যদিয়ে দুই ঘণ্টা পায়ে হেঁটে বন পার হয়ে গেলেই চোখে পড়ে লালদিয়া। বনের পূর্ব প্রান্তে সমুদ্র সৈকত, দেখলে সবারই নজর কাড়বে। এছাড়াও রয়েছে সবুজে ভরা কেওড়া গাছ। এ গাছের সঙ্গে কমবেশি সবাই পরিচিত। এ বনাঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু গাছের মধ্যে কেওড়া গাছ অন্যতম। এ গাছ উপকূলীয় এলাকার পরিবেশে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে থাকে।

কেওড়া উপকূলীয় অঞ্চলের অতিপরিচিত একটি ফল। সুন্দরবনের সহজলভ্য কেওড়া ফল উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। সবুজ রঙের ফলের ওপরের মাংসল অংশটুকু স্বাদে টক। কেওড়া ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। ফলটির রয়েছে প্রচুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। কেওড়া ফল রক্তে কোলেস্টেরল ও শরীরের চর্বি (ফ্যাট) কমায়। এতে কিছু এনজাইম আছে, যা বিশেষত বদহজমে ব্যবহৃত হয়।

টক স্বাদের এই ফলটি বহুকাল আগে থেকেই বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জনপ্রিয় খাদ্য। কাঁচা ফল লবণ সহকারে খাওয়া যায়। এ ফল দিয়ে কেওড়াজল তৈরি করা হয় যা বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহৃত হয়। কেওড়ার চাটনি, টক আর ডাল রান্না করে রসনা মেটাচ্ছেন অনেকেই। এছাড়া ফলটি যে কোনো মানুষের স্বাস্থ্যের কয়েকটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে সক্ষম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয় এ ফল। কখনো কখনো সুবিধা বুঝে দেশের বাইরেও রফতানি করা হয়ে থাকে। এ ফলটি টক স্বাদযুক্ত হওয়ায় বিভিন্ন জায়গায় রফতানি করে অনেক পরিবার আয়ও করেছে।

অন্যদিকে সুন্দরবনে উৎপন্ন মধুর একটা বড় অংশ আসে কেওড়া ফুল থেকে। তাই এ গাছটি হয়ে উঠতে পারে লবণাক্ততায় আক্রান্ত কর্দমাক্ত জমির বিশেষ ফসল। এ গাছ উপকূলীয় মাটির ক্ষয়রোধ করে মাটিকে দেবে দৃড়তা ও উর্বরতা, রক্ষা এবং লবণাক্ত পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে পারে। কেওড়া গাছ সাধারণ বৃক্ষ প্রজাতির হয়ে থাকে। গাছের শ^াসমূল মাটির ওপরে উঠে আসে, প্রচুর ফল হয় গাছে। কেওড়া ফল দেখতে অনেকটা ডুমুরের মতো। হরিণঘাটাসহ বিষখালী ও বলেশ^র নদের তীরবর্তী বনাঞ্চলের কয়েক হাজার বানর ও হরিণ কেওড়া গাছের পাতা ও ফল খেয়ে বেঁচে থাকে।

সরকারিভাবে এ ফলটি বিক্রি অবৈধ হলেও অনেকে গোপনে এ পেশায় অবৈধভাবে ঢুকে কেওড়া পাচার করেছে। তবে এটি বাণিজ্যিক হিসেবে সরকার বৈধ করলে শুধু কেওড়া গাছ নয়, কেওড়া ফলকে ঘিরেও নতুন শিল্প গড়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে। কেওড়া ফল বিক্রি সরকারিভাবে বৈধ না হলেও কিছু লোভী ব্যবসায়ীরা এ ফলটি বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করছেন। অবশ্য অনেক দরিদ্র পরিবার এ ফল আহরণ ও বিক্রি করে সচ্ছল হয়েছেন। প্রতি বছর এ বর্ষা মৌসুমে পাথরঘাটা থেকে প্রচুর ফল বিক্রি করা হয়ে থাকে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সেল কর্তৃক এক গবেষণায় দেখা যায়, কেওড়া ফলে রয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ শর্করা, ৪ শতাংশ আমিষ, ১ দশমিক ৫ শতাংশ ফ্যাট, প্রচুর ভিটামিন; বিশেষত ভিটামিন সি এবং এর ডেরিভেটিভ। কেওড়া ফল পলিফেনল, ফ্লাভানয়েড, অ্যান্থোসায়ানিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও আনস্যাচুরেটেড ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড বিশেষ করে লিনোলেয়িক অ্যাসিডে পরিপূর্ণ। তাই মনে করা হয়, ফলটি শরীর ও মনকে সতেজ রাখার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে কার্যকরী। চায়ের মতো এ ফলটিতে ক্যাটেকিনসহ বিভিন্ন ধরনের পলিফেনল প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। এ দেশে প্রাপ্ত ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পলিফেনল রয়েছে আমলকিতে, তারপরই হলো কেওড়া ফলের অবস্থান।

কেওড়া ফলে সমপরিমাণ আপেল ও কমলার তুলনায় অনেক বেশি পলিফেনল ও পুষ্টি উপাদান রয়েছে। পলিফেনল শরীরে ডায়াবেটিস, ক্যানসার, আথ্রাইটিস, হৃদরোগ, এলার্জি, চোখের ছানি, বিভিন্ন ধরনের প্রদাসহ প্রভৃতি রোগ সৃষ্টিতে বাধা প্রদান করে। ফলটিতে আমলকি, আপেল ও কমলার তুলনায় বেশি পরিমাণ পটাশিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেশিয়াম ও জিংক রয়েছে। এ ফলের রয়েছে ডায়রিয়া ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধী এবং ব্যথানাশক গুণাগুণ। ফলটি ডায়রিয়া, আমাশয় ও পেটের পীড়ার জন্য দায়ী ব্যাক্টেরিয়াকে কার্যকরীভাবে দমন করতে পারে। তাছাড়া কেওড়া ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ পালমিটিক অ্যাসিড, অ্যাস্করবাইল পালমিটেট ও স্টিয়ারিক অ্যাসিড যা খাদ্যশিল্পে খাদ্য পক্রিয়াকরণে এবং তৈরি খাদ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।

স্থানীয় সাংবাদিক জাকির হোসেন বলেন, সাগরপাড়ের এ এলাকায় ফলটি ব্যাপকভাবে জন্মানোর উদ্যোগ নিলে উপকূলের জনগণের বাড়তি আয়ের উৎস হবে। উপকূলীয় পরিবেশের গুণগতমানের উন্নয়ন হবে ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে।

বনবিভাগের পাথরঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান এ ব্যাপারে বলেন, জোয়ার-ভাটা হয় এমন চরভরাটি জমিতে যদি বাণিজ্যিকভাবে কেওড়া চাষ করা হয় তাহলে একদিকে বাঁধ ও পরিবেশ এবং বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ করার পাশাপাশি এর কাঠ জ্বালানি ও ফল বাজারে বিক্রি করে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব। এখন পর্যন্ত কেওড়া গাছ ও ফল বিক্রি আইনত দন্ডনীয়। সরকার চাইলে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ করলে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় অর্থনীতির নতুন দিগন্তের সূচনা হতে পারে।

 

"