জার্মানির কারাগারে উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে মগজ ধোলাই!

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

প্যারিস, ব্রাসেলস ও বার্লিনে সন্ত্রাসী হামলাকারীরা কারাগারের ভেতরে সহিংস মৌলবাদের ধারণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। চরমপন্থার বিস্তার ঠেকাতে জার্মানির কারাগারগুলোতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ, এ পদক্ষেপের লক্ষ্য হচ্ছে চরমপন্থিদের মাথা থেকে ভুল চিন্তাগুলো ও অন্যের প্রতি হিংসাত্মক কুচিন্তাগুলো দূর করা। জার্মানির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য নর্থ রাইন ওয়েস্টফালিয়া। এখানে ৩৬টি কারাগার আছে। তার একটি বখুম শহরে। বাটুহান (ছদ্মনাম) ২০১৪ সাল থেকে এই কারাগারে জালিয়াতির অভিযোগে সাজা ভোগ করছেন। এই রাজ্যের ১৬ হাজার কারাবন্দির এক চতুর্থাংশ মুসলিম। বাটুহান তাদের একজন। তিনি সাধারণ অপরাধী। তবে রাজ্যের কারাগারগুলোতে এ বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সহিংস উগ্রবাদের ধারণায় উদ্বুদ্ধ এমন ৩৩ জন মুসলিম আটক আছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও অনুমতি মেলেনি। তবে বাটুহানের মতো সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছে ডয়চে ভেলে।

তার মতে, অনেক বন্দির কাছে ধর্ম খুব গুরুত্বপূর্ণ, তিনি যে ধর্মেরই হোন না কেন। তিনি বলেন, অন্য বন্দিদের সঙ্গে ইসলাম নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। ইসলামের নামে যখনই কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয়, তখন এর কারণ নিয়ে আমরা আলোচনা করি।

সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে ইসলাম নিয়ে আলোচনার নামে অনেকে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদের ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। জার্মানির কারাগারগুলোতে এমন চেষ্টার খবর আগেও মিলেছে। গত বছর জার্মানির শহর কার্লসরুহের ফেডেরাল প্রসিকিউটরস অফিস এমন ৮৫৫টি ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত করেছে।

এছাড়া গত বছরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সিরিয়ার কুর্দিশ এলাকায় আইএসের পরাজয়ের পর আটককৃতদের ১২০ জন জার্মান বা জার্মানির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ইউরোপে এর আগে যতজন মুসলিম সন্ত্রাসী হামলা করেছেন তারা বেশির ভাগই কারাগারের ভেতরে অন্য বন্দির মাধ্যমে উগ্রপন্থায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। ২০১৫ সালে প্যারিস ও ২০১৬ সালে ব্রাসেলসে হামলায় জড়িতরা কারাগারে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এমনকি ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বার্লিনে ক্রিস্টমাস মার্কেট হামলায় সাতজন মারা যান। এই হামলার হোতা আনিস আমরিও একইভাবে কারাগার থেকেই উগ্রভাবাপন্ন হয়ে উঠেন।

লন্ডন কিংস কলেজের ব্যাডিক্যালাইজেশন রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা বলছে, পশ্চিম ইউরোপ থেকে পাঁচ হাজারেরও বেশি জিহাদি আইএসে যোগ দিয়েছেন। এদের অর্ধেকেরও বেশি বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন কিংবা চুরি ও মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধে অতীতে জড়িত ছিলেন।

জার্মানির কারাগারগুলোতে সাধারণত উগ্র মৌলবাদীদের আলাদা রাখা হলেও ২৪ ঘণ্টা সেটা করা সম্ভব হয় না। যখন তারা খেতে কাজ করতে যান, তখন আর আলাদা করা সম্ভব হয় না।

তাদের জন্য কাউকে দলে টানা (বাইরের চেয়ে) এখানে বেশি সোজা, বলেন বাটুহান। অবশ্য এখনো তার তেমন অভিজ্ঞতা হয়নি বলে জানান তিনি।

তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান আইনজীবী নুমান ও্যসার গত সাত বছর ধরে কোলনের একটি সংশোধন প্রকল্পে কাজ করেন, যার নাম ‘ওয়ান এইটি ডিগ্রি টার্ন অ্যারাউন্ড’। ২০১৫ সাল থেকে তিনি নিয়মিত নর্থ রাইন ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যের কারাগারগুলোতে যান। তিনি মুসলিম বন্দিদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, উগ্রপন্থিরা নিজেদের মতাদর্শ ছড়াতে কারাগারগুলোকে ব্যবহার করছেন। কারাবন্দিরা মানসিকভাবে একটা গর্তের মধ্যে থাকেন, বলেন তিনি। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সহিংস মৌলবাদীরা অন্যদের বলেন যে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। যুদ্ধে লুটপাট করা জায়েজ। এগুলো বলে তারা তরুণদের তাদের দলে টানার চেষ্টা করেন, বলেন তিনি। এরপর তাদের দিয়ে নানা অপরাধে অভ্যস্ত করানো হয়।

নর্থ রাইন ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যের কারাগারগুলোতে চরমপন্থার বিরুদ্ধে নানা কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। যারা উগ্র মতাবাদে জড়িয়েছেন তাদের সংশোধনে যেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, এসব মতবাদ যেন ছড়াতে না পারে। বিচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২০১৬ সালে প্রায় তিন হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কারাগারগুলোতে ২৬ জন ইমাম রয়েছেন, যাদের সব রকম নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই ইমামরা বন্দিদের জুমাসহ অন্যান্য ওয়াক্তের নামাজ পড়ান। তারাও উগ্র মতবাদ যেন না ছড়ায় সে লক্ষ্যে কাজ করেন। তবে বাটুহান ধর্মের প্রতি আগের চেয়ে বেশি মনোযোগী হয়েছেন কারাগারে এসে। চার দেয়ালের মাঝে থাকেন। হাতে অফুরন্ত সময়। এখানে থাকতে থাকতে আগের মতো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, অযথা সময় নষ্ট করা এসব নিয়ে চিন্তা করার অনেক সময় পেয়েছেন। ২০২১ সালে তিনি মুক্তি পাবেন। তিনি মনে করেন, বাইরে বেরিয়ে তিনি কারাগারের মতো ধর্মচর্চা অব্যাহত রাখবেন।

"