বাড়ছে ক্ষুধা : ভূমি হারাচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

ভূমির ব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বৈজ্ঞানিক সংস্থা।

এ সংস্থা জানিয়েছে, খাদ্য ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনাটা গোটা বিশ্বের মানুষের জীবন-জীবিকা এবং স্বাস্থ্যের চাবিকাঠি এবং তা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলের (আইপিসিসি) প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বিশ্বের জনবসতি বাড়ছে। বাড়ছে খাদ্যের চাহিদা। সময়ের সঙ্গে এই চাহিদা আরো বাড়বে। কিন্তু পৃথিবীর সম্পদের পরিমাণ সীমিত, ভূমির ফসল ও ঘাস জন্মানোর ক্ষমতা কমছে ক্রমেই। তাই সম্পদের অপব্যবহার রোধ এবং বনভূমি উজাড় করা বন্ধের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। ৫২টি দেশের ১০৩ জন বিশেষজ্ঞ গত দুই বছর ধরে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন।

এই প্রতিবেদনে সুন্দর আগামীর ছবি আঁকেননি বিশেষজ্ঞরা। বরং তারা বলছেন, বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ন যদি প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়ায় আবাদি জমি মরুভূমিতে পরিণত হবে। ভেঙে পড়বে অবকাঠামো। খরা এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ঝুঁকিতে ফেলবে দুনিয়ার খাদ্য ব্যবস্থাকে। তবে এখনই হাল ছেড়ে দিচ্ছে না আইপিসিসি। বলা হচ্ছে, প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো মেনে চললে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ভূমির ওপর অতিরিক্ত চাপ মোকাবিলা করেও সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব।

প্রতিবেদনটির মূল অনুসন্ধান : ১. বিশ্বে ২৩ শতাংশ গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গত হয় ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহার থেকে। বাড়ার কারণ আবাদি জমির নামে বনভূমি উজাড় করে ফেলা। গবাদি পশু আর ধান খেতের কারণে বাড়ছে মিথেন। ২. এভাবে ক্ষতিকর উপাদানগুলো নির্গত হতে থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। বৈরী আবহাওয়ায় ভেঙে পড়তে পারে খাদ্য-শৃঙ্খল। পুষ্টির অভাবে কমে যাবে কৃষিজ পণ্যের ফলন।

৩. ১ দশমিক ৫ শতাংশ উষ্ণতার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ১৮ কোটি মানুষ পানিবঞ্চিত হবে এবং শুরু হবে মরুকরণ। আর তা যদি ২ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়, তবে একই সময়ের মধ্যে এই পরিণতি বরণ করবে ২২ কোটি মানুষ। ৪. বিশ্বের সবাই সম্মিলিতভাবে ভূমির স্থিতিশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে মাটির উর্বরতা আর বনায়ন প্রক্রিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের লাগাম টেনে ধরায় ভূমিকা রাখতে পারবে।

জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের ৮২ কোটি লোক খাবারের তীব্র অভাবে ভুগছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরের কম বয়সি ১৪ কোটি ৯০ লাখ শিশু।

আইপিসিসি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফসলের উৎপাদন যেমন কমবে। ঠিক তেমনি বাড়বে খাদ্যের দাম। ২০৫০ সাল নাগাদ খাদ্যশস্যের দাম ২৩ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। কার্বন নিঃসরণ এভাবে চলতে থাকলে, পরবর্তী ৬০ বছরে অ্যামেরিকার ভুট্টা ও সয়াবিনের উৎপাদন ৮০ শতাংশ কমে যেতে পারে।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনেও ‘প্রধান খাদ্য’ উৎপাদন হ্রাস পাবে বলে ইঙ্গিত করেছে। ভারতের দক্ষিণে ২০৩০ সালের মধ্যে চাল উৎপাদন ৫ শতাংশ কমে যাবে। পরবর্তী তিন দশকে সেটা ১৪ শতাংশে গিয়ে উন্নীত হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এছাড়াও আবহাওয়াতে আসছে পরবর্তন। বৈরী আবহাওয়ার খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও করছে। হিসাব বলছে, এখনই উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের এক তৃতীয়াংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

আইপিসিসি বলছে, সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। ঘুরে দাঁড়াতে হবে এখনই। প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, বনভূমি উজাড় করা থামাতে হবে। নতুন এবং অনাবাদি ভূমিগুলোকে ফসল উপযোগী করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে মনোযোগী হয়ে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা যাবে না বলেও উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে।

আমরা কী খাই, কীভাবে খাইÑ সে বিষয়ে সচেতনতা থাকাটাও প্রয়োজন। ১২ প্রজাতির উদ্ভিদ আর পাঁচ প্রজাতির পশু থেকে বিশ্ব খাদ্য চাহিদার ৭৫ শতাংশ আসে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, থালায় নিয়ে যখন কেউ খায়, তার মনে রাখা উচিত এটি আকাশ থেকে আসেনি। এটি তৈরিতে শ্রম যেমন আছে তেমনি প্রাকৃতিক সম্পদও আছে। সচেতনতাকে এই সংকট মোকাবিলা বড় হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

 

"