ফিলিপাইনে খাদ্যের অপচয় ঠেকাতে অভিনব উদ্যোগ!

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

আধুনিক জীবনযাত্রায় মানুষের জীবনে সচ্ছলতা এসেছে, সঙ্গে বেড়েছে খাবার নষ্ট করা ও অপচয়। নষ্ট খাবার আবর্জনা হয়ে নষ্ট করছে পরিবেশ। হচ্ছে বায়ুদূষণ। ফিলিপাইনে এক প্রকল্পের আওতায় খাদ্যের অপচয় কমানোর চেষ্টা চলছে। আবর্জনার স্তূপে উচ্ছিষ্ট খাবার দেখলে খাওয়ার ইচ্ছা জাগার কথা নয়। কিন্তু ক্ষুধার চোটে বাধ্য হয়ে এসব খেতে হয়। ম্যানিলা শহরে ভোর থেকেই আবর্জনা কুড়ানিরা ফেলে দেওয়া খাদ্যের সন্ধান চালিয়ে যান। ফিলিপা বাল্ডে নিজের পরিবারকে এই ‘পাগপাগ’ বা আবর্জনার স্তূপে কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যের অবশিষ্ট অংশ খাওয়ান। ফিলিপাইনে ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দিনে তিনবেলা খাবার সামর্থ্য নেই। দ্য ডেইলি মেইল গতকাল বৃহস্পতিবার এ খবর জানায়।

ফিলিপাইনে খাদ্যের অপচয়ও কম হয় না। পকেটে টাকা থাকলে রেস্তোরাঁয় ‘যত পারো তত খাও’ বুফে ভোজে অফুরন্ত খাবার খাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত প্লেট যে খালি হয় না, তাতে বিস্ময়ের কারণ আছে কি? ডাব্লিউডাব্লিউএফের মেলোডি মেলো-রাইক মনে করিয়ে দেন, ‘যখন আপনি খাবার নষ্ট করছেন, তখন আসলে অনেক সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। যেমন, পানি, বিদ্যুৎ ও মাটির পুষ্টি। খাবার উৎপাদন, পাঠানো, বিতরণের মতো অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ার মধ্যেও অপচয় ঘটে। এসব বিষয় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ত্বরান্বিত করছে।’ মেলোডি মেলো-রাইক এমন এক প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার আওতায় রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলোকে খাদ্য অপচয় কমানোর বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। ম্যানিলা থেকে গাড়িতে ঘণ্টাদেড়েক দূরে পর্যটকদের প্রিয় তাগাইতাই শহর। মেলোডি সেখানকার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন।

সপ্তাহান্তে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অসংখ্য মানুষ শহরের ব্যস্ততা থেকে পালিয়ে সেখানে চলে যান। বলা বাহুল্য খাওয়া-দাওয়াও মনোরঞ্জনের মধ্যে পড়ে। সেখানকার পিকনিক পার্ক একটা বড় আকর্ষণ। ফিলিপাইনের মানুষ সাধারণত দিনে পাঁচবার খাওয়া-দাওয়া করেন। এখানে সবাই বাসা থেকে কিছু না কিছু নিয়ে আসেন।

দেশে সমৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপচয়ের মাত্রাও বাড়ছে। সারা বছর গোটা দেশে প্রায় ৩ লাখ টন চাল ফেলে দেওয়া হয়। মার্লন আসুয়েলোর মতো কিছু মানুষ এই প্রবণতার বিরুদ্ধে কিছু একটা করতে চান। স্পা হোটেলের রাঁধুনি হিসেবে তিনি শুধু অতিথিদের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করতে চান না। জঞ্জালের পরিমাণ কমাতেও তিনি উদ্যোগ নিচ্ছেন।

পারলে সব কিছুই কাজে লাগাতে চান তিনি। অবশিষ্ট অরগ্যানিক জঞ্জাল কাজে লাগিয়ে তিনি সার তৈরি করেন। মার্লন তার অতিথিদের আচরণের ওপরেও প্রভাব রাখছেন। মার্লন আসুয়েলো বলেন, আসলে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো প্লেটে খাবারের পরিমাণ স্থির করা। কারণ আগে আমরা প্রচুর পরিমাণ খাবার পরিবেশন করতাম। ফলে তার অনেকটাই নষ্ট হতো। তাই আমরা পরিমাণ কমানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু আমাদের খাদ্য তালিকায় কিছু পদ এখনো দুজন অথবা পাঁচজনের পরিবারের জন্য যথেষ্ট হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু একক ব্যক্তিদের জন্য আমরা পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছি। এমনভাবে প্লেট সাজাচ্ছি, যাতে মনে হয় তাতে অনেক খাবার রয়েছে।

মার্লন আসুয়েলো মেলোডির প্রকল্পে অংশ নিচ্ছেন। তাকে সাধারণত রাঁধুনিদের বুঝিয়ে বলতে হয়, যে খাদ্যের অপচয় কীভাবে জলবায়ুর ক্ষতি করছে। মেলোডি বলেন, খাদ্যের অপচয় ঘটলে সেগুলো আবর্জনার স্তূপে গিয়ে জমা হয়। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় ক্ষয়ের সময় সেগুলো মিথেনের মতো আরো মারাত্মক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে, যা কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় ২০ গুণেরও বেশি শক্তিশালী। ফলে আমাদের বায়ুমন্ডলে উষ্ণতা বন্দি হয়ে পড়ে।

রাঁধুনি হিসেবে মার্লন জানেন যে, দামি হোটেলে কোর্সের আয়োজন করলে শুধু হাতেগোনা কিছু মানুষ এ বিষয়ে সচেতন হবেন। অদূর ভবিষ্যতে আর শুধু স্বেচ্ছায় অপচয় কমালে চলবে না। নতুন এক আইন কার্যকর হলে ফিলিপাইনে রেস্তোরাঁ ও সুপারমার্কেটগুলোকে উদ্বৃত্ত খাবার দান করতে হবে। ততদিন পর্যন্ত বস্তা বস্তা বর্জ্য খাবার আবর্জনার স্তূপে জমা হতে থাকবে, যেমনটা ম্যানিলার পায়াতাস নামের এলাকায় দেখা যায়। ধনীদের আবর্জনা দরিদ্রদের জীবনধারণের ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

ফিলিপা বাল্ডে তার ‘পাগপাগ’ নিয়ে বাসায় ফিরছেন। দুই বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর ৬৭ বছর বয়সি এই নারীর কাঁধে সংসার চালানোর দায়িত্ব এসে পড়েছে। তখন থেকেই তিনি আবর্জনা কুড়ানি হিসেবে কাজ করছেন। বাসায় ফিরে তিনি কুড়িয়ে পাওয়া মুরগির মাংস ব্যাকটেরিয়া-মুক্ত করতে পানিতে ফোটাচ্ছেন। পেঁয়াজ ও মসলা যোগ করে তিনি সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য রাতের খাবার রান্না করলেন। তিনি এই কঠিন পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, এখানে হয় কাজ আছে কিংবা নেই। অবশ্যই এমন খাবার খেতে না হলেই ভালো হতো। কিন্তু এছাড়া উপায় নেই। জীবন বড় কঠিন। ধনীদের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকলেও ভবিষ্যতে অপচয়ের বদলে উদ্বৃত্ত খাবার দান করা হলে ফিলিপা বাল্ডের জীবনযাত্রা অনেক সহজ হয়ে উঠবে। কারণ তার মতে, আবর্জনার দুর্গন্ধে কখনোই কারো আনন্দ লাগতে পারে না।

"