দিনে বিক্রি ৩ হাজার টিকিট কাউন্টার মাত্র দুটি

প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

মাইনুদ্দী রুবেল, (বিজয়নগর) ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথে চলাচলকারী ১৪টি আন্তঃনগর ট্রেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে যাত্রাবিরতি করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে প্রতিদিন তিন হাজারেরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়। কিন্তু স্টেশনে টিকিট কাউন্টার আছে মাত্র দুটি। স্টেশনে টিকিট সংগ্রহের জন্য আলাদা কোনো কাউন্টার নেই। এতে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকলেও যাত্রীরা টিকিট কাটতে পারেন না। এ কারণে টিকিট না কেটে ট্রেন ভ্রমণের জন্য টিটির হাতে ধরা পরে ভাড়ার দ্বিগুণ অর্থ জরিমানা গুনতে হয় যাত্রীদের।

জানা গেছে, টিকিট বিক্রির দিক থেকে থেকে ঢাকা, বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের পরেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের অবস্থান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন সূত্রে জানা গেছে, নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী উপকূল এক্সপ্রেস, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা চট্টলা এক্সপ্রেস, মহানগর এক্সপ্রেস, মহানগর গোধূলী, তূর্ণা নিশিতা, সিলেট থেকে ছেড়ে আসা জয়েন্তিকা এক্সপ্রেস ও পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাত্রা বিরতি দেয়। অপরদিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী, চট্টলা এক্সপ্রেস মহানগর এক্সপ্রেস, তূর্ণা নিশিতা, নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেস, সিলেটগামী জয়েন্তিকা এক্সপ্রেস ও পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। এসব ট্রেনের অগ্রিম, ট্রেন আসার আগ পর্যন্ত ও জরুরি টিকিট সংগ্রহের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে মাত্র দুটি কাউন্টার রয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়কেই এই দুটি কাউন্টার থেকে টিকিট নিতে হয়। অপরদিকে সব ধরনের মেইল ট্রেনের জন্য তিনটি কাউন্টার থাকলেও একটি কাউন্টারে টিকিট দেয়া হয়। বাকি দুটি প্রায়ই সময় বন্ধ থাকে।

ট্রেনযাত্রী সামিউল উসমান, মো. রিপন মিয়া, ফারজানা খানম, টুম্পা দত্ত প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, দুটি কাউন্টার থেকে আন্তঃনগর সব ট্রেনের টিকিট দেয়া হয়। অগ্রিম টিকিটও এই দুটি কাউন্টার থেকে নিতে হয়। ট্রেন আসার ১ ঘণ্টা আগে স্টেশন গিয়ে যাত্রীদের দীর্ঘ সারিতে পেছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতেই ট্রেন চলে আসে। পরে দেখা যায়, স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকলেও টিকিট সংগ্রহ করা যায় না। এমন অনেকবার হয়েছে যে টিকিট কাটতে না পেরে ট্রেনে উঠতে পারিনি। আবার অনেকবার ট্রেনে উঠলেও ট্রেনের ভেতরে মোবাইল কোর্ট থাকে। তখন বাধ্য হয়ে জরিমানা গুনতে হয়। তারা বলেন, আমরা টিকিট কাটতে আগ্রহী। তারপরও আমাদের নিরুপায় হয়ে বিনাটিকিটে রেলভ্রমণ করতে হয়।

ঢাকা, বিমানবন্দর ও চট্টগ্রামের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনের অবস্থান। এই স্টেশনে অনেক টিকিট বিক্রি হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের প্রভাষক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, আমি গত শুক্রবার সকালের উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনে ঢাকার যাওয়ার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে গিয়ে যাত্রীদের লম্বা সারি দেখতে পাই। ততক্ষণে ট্রেনও আসার সময় হয়ে যায়। অনেক কষ্টে টিকিট কাউন্টারে নিজের পরিচয় দিয়ে দুটি আসনবিহীন টিকিট সংগ্রহ করি। তিনি বলেন, এই স্টেশন থেকে প্রচুর যাত্রী ঢাকায় আসা-যাওয়া করে। এখানে শুধু জরুরি অবস্থায় (ইমার্জেন্সি) টিকিট সংগ্রহের জন্য একটি আলাদা কাউন্টার থাকা দরকার। যেটি হয়তো ট্রেন আসার এক থেকে আধা ঘণ্টা আগে খোলা হবে। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশন সূত্রে আরো জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জন্য ঢাকাগামী উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনের শোভন শ্রেণির ১২৭টি, চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনের ৭০টি, মহানগর এক্সপ্রেসের শোভন শ্রেণির ১০০টি ও প্রথম শ্রেণির এসি ১০টি আখাউড়া পর্যন্ত ৬টি, মহানগর গোধুলী ১০০টি ও এসি ১০টি আখাউড়া পর্যন্ত ৬টি, তূর্ণা নিশিতার ৪০টি, জয়েন্তিকা এক্সপ্রেসের ১০টি ও পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনের ৪০টি ও এসিতে ১০টি আসন বরাদ্দ রয়েছে। অপরদিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী ট্রেনের ৫০টি, আখাউড়া পর্যন্ত ৬টি, চট্টলা এক্সপ্রেসের ৫০টি, কেবিনে ৬টি কুমিল্লা পর্যন্ত ৫টি ফেনী পর্যন্ত ৫টি লাকসাম পর্যন্ত ৫টি বরাদ্দ রয়েছে, কুমিল্লা পর্যন্ত ৫টি, ফেনী পর্যন্ত ৫টি, লাকসাম পর্যন্ত ৫টি, মহানগর এক্সপ্রেসর ৬৫টি, এসি ১০টি, তূর্ণা নিশিতার ৫০টি ও এসি পাঁচটি, নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেসের ১০টি, সিলেটগামী জয়েন্তিকা এক্সপ্রেসের ২০টি ও সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেসের ২০টি, এসি ৫টি, এই ট্রেনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে শ্রীমঙ্গল পর্যন্ত ৫টি, কুলাউড়া পর্যন্ত ৫টি আসন বরাদ্দ রয়েছে।

স্টেশনের প্রধান বুকিং সহকারী সূত্রে জানা গেছে, গত ১ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত ১০ দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশন থেকে ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-ঢাকা পর্যন্ত সব আন্তঃনগর ট্রেনের ৩১ হাজার ১১৬টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। এসব রেলপথে ১৪টি আন্তঃনগর ট্রেনের ৮১৬টি আসন থাকলেও প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার ১১৬টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিদিন আসনবিহীন ২ হাজার ৩০০ ট্রেনের টিকিট গড়ে বিক্রি হয়েছে। ১১ থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত এই ১৪টি আন্তঃনগর ট্রেনের ২৮ হাজার ১৬০টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। যার প্রতিদিনের গড় ২ হাজার ১৬০টি টিকিট। যার মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজারেরও বেশি আসনবিহীন টিকিট বিক্রি হয়। ঈদের সময় আসলে আরো বেড়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্টেশনের এক টিকিট বুকিং সহকারী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, এই স্টেশনে প্রতিদিন ১৪টি আন্তঃনগর ট্রেন যাত্রাবিরতি দেয়। প্রত্যেক ট্রেনের জন্য প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২২০টি আসনবিহীন টিকিট বিক্রি হয়। মো. এনায়েত হোসেন নামে এক যাত্রী বলেন, ট্রেন চলে আসায় টিকিট ছাড়াই ট্রেনে উঠে পড়ি। পরে বিমানবন্দর পৌঁছে ১২০ টাকার ভাড়া দিতে হয়েছে ২২০টা। তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে উঠলেও মাঝে মাঝে ট্রেনের ভেতরের টিটিরা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করেন। অন্তত ১৫-২০ জন যাত্রী যাদের একাধিকবার জরিমানা গুনতে হয়েছে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে একটি আলাদা (ইমার্জেন্সি) টিকিট কাউন্টার করা দরকার। যেখান থেকে শুধুমাত্র আগত ট্রেনের টিকিট দ্রুত দেওয়া হবে। শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয় কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রামও আলাদা জরুরি কাউন্টার করা উচিত কেননা যখন মানুষ দেখবে সহজেই টিকিট পাওয়া যায় তখন সবাই টিকিট কেটেই ট্রেনে উঠবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশন মাস্টার সুহেব মিয়া প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে যে পরিমাণ ট্রেনের আসন আছে তার থেকে অনেক বেশি যাত্রী যাতায়াত করে। প্রতিদিন আসনবিহীন টিকিট প্রায় ২ হাজারেরও বেশি বিক্রি হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আরো কয়েকটা আন্তঃনগর ট্রেন দাঁড়ালে কিছু মানুষ বসে যেতে পারবে। আলাদা জরুরি কাউন্টার প্রসঙ্গে বললে তিনি বলেন, এমন কোথাও নেই। আলাদা (ইমার্জেন্সি) কাউন্টার করা যায়, করলে সবাই সহজেই টিকিট কাটতে পারবে। তবে এজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও বাড়তি লোকবল দরকার।

 

"