ভারতের রাজনীতি

প্রিয়াঙ্কায় ইন্দিরার ছায়া

প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর ছায়া আরো দীর্ঘ হচ্ছে। যেভাবে শনিবার বিকালে উত্তরপ্রদেশের সনভদ্রের দলিত পরিবারের সঙ্গে দেখা করে চুনার দুর্গে কার্যত বন্দিদশা কাটিয়ে দিল্লি ফিরেছেন প্রিয়াঙ্কা তাতে অনেকে প্রিয়দর্শিনীর কথা মনে পরে যেতে বাধ্য। ১৯৭৭-এ লোকসভা নির্বাচনের পর ঠিক এভাবে এক মাঝরাতে ইন্দিরা গান্ধী পৌঁছে গিয়েছিলেন বিহারের বেলচি গ্রামে, সেখানেও উচ্চবর্ণের হাতে সে সময় খুন হয়েছিলেন ১১ জন দলিত গ্রামবাসী। চার দশক সময় পর, ঠাকুমার মতোই ক্ষমতা থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়া দেশের প্রাচীনতম দলের নেত্রী হিসেবে পৌঁছে গেছেন উত্তরপ্রদেশের সনভদ্রে, ১০ জন দলিতকে জমি ইস্যুতে গুলি করে মেরে ফেলার প্রতিবাদ জানাতে। আর তারপর রাতভর চুনার দুর্গে প্রায় অন্ধকারে এয়ারকন্ডিশন ছাড়া ঘরে রাত্রিবাস করে যোগী আদিত্যনাথ সরকারকে কার্যত বাধ্য করেছেন সনভদ্রে মৃত দলিতদের আত্মীয়দের তার সঙ্গে দেখা করানোর জন্য নিয়ে আসত। আর দেখা করে দিল্লি ফিরে যাওয়ার পথে জানিয়ে দিয়ে গেছেন, শেষ না দেখে তিনি ছাড়ছেন না। যে কঠোরতার জন্য ইন্দিরা গান্ধীকে, আমেরিকান ব্লক লৌহমানবী বলতো, সেই দৃঢ়তা এখন দেখা যাচ্ছে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মধ্যে।

সনভদ্রের ঘটনা নিয়ে যোগী সরকারের ওপর গত দুই দিনে চাপ বাড়ছিল। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরে কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে আটকে দেওয়া, তাকে চুনার দুর্গে কার্যত বন্দি করে রাখার ঘটনা সেই চাপ আরো বাড়িয়েছে। প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে যোগী আদিত্যনাথ সরকারকে। শেষ পর্যন্ত সেই বাধা তুলে রাজ্য প্রশাসন জানিয়ে দিয়েছেন, যেখানে খুশি যেতে পারেন প্রিয়াঙ্কা। তারপরই শনিবার সকালে চুনার দুর্গে নিহতদের কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। সকালে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা চুনারে এসে ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে। প্রিয়াঙ্কাকে কাছে পেয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের সান্ত¡না দিতেও দেখা গেছে প্রিয়ঙ্কা গান্ধীকে, কথাও বলেছেন তাদের সঙ্গে। ঠিক যেমন করে দুর্গতদের সঙ্গে বা সফরে বেরিয়ে, কাছে টেনে নিয়ে কথা বলতেন ইন্দিরা গান্ধী।

আসলে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর চাপের কাছে হার মানতে হয়েছে যোগী আদিত্যনাথ সরকারকে। শুধু রাজনীতির চাপ নয়, ব্যক্তিত্বের চাপ। যে চাপ, বিরোধীদের ওপরে অনায়াসে দিতে পারতেন প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা গান্ধী। আর তাকে ঠাকুমার মতো দেখতে বলে যে তুলনা হয়, তা এবার কার্যত উড়িয়ে দিয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি অনেক দিক থেকেই ঠাকুমারই মতো। সকালেও প্রিয়াঙ্কা ফের চুনার থেকে সনভদ্রে যাওয়ার উদ্যোগ নেন, তাকে ফের আটকানো হয়। তখন চুনারের ভেতরেই প্রতিনিধিদলকে নিয়ে ধরনায় বসে পড়েন প্রিয়াঙ্কা । তার অভিযোগ, মাত্র দুজনের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়। বাকি ১৫ জনকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এর পরই প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেছেন, তার লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, দেখা যাক প্রশাসন কী বলে। এর পরই প্রিয়াঙ্কা দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে বলেছেন, আবার ফিরে আসবেন।

গত শুক্রবার মির্জাপুরে ধর্নাস্থল থেকে তুলে নিয়ে চুনার দুর্গের অতিথিশালায় রাখা হয়েছিল প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে। রাতভর সেখানেই কাটান সঙ্গীদের সঙ্গে, মধ্য রাতে রাজ্য সরকারের এক শীর্ষ আধিকারিক এবং বারানসী পুলিশের এডিজি চুনার দুর্গে যান। সনভদ্রে না যাওয়ার জন্য প্রিয়াঙ্কাকে অনুরোধ করেন। কিন্তু প্রিয়াঙ্কা জানিয়ে দেন নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা না করতে দিলে চুনার থেকে এক পাও নড়বেন না। রাত ১টা নাগাদ রাজ্য প্রশাসনের আধিকারিকরা ফিরে যান। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী অভিযোগ করেছেন কেন তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল তার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ রাজ্য সরকার দেখাতে পারেননি। শুধু তাই নয় এ সংক্রান্ত কোনো নথিও দিতে পারেননি। চুনার দুর্গে রাতের একটি ভিডিও টুইট করেছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। যোগী আদিত্যনাথর সরকারের সঙ্গে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর টানাপড়েন শুরু হয়েছিল শুক্রবার সকাল থেকে। সনভদ্রে নিহত পরিবারগুলোর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ছিলেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। কিন্তু মির্জাপুরের কাছে তাকে আটকে দেয় পুলিশ। বাধার মুখে পড়ে ধরনায় বসে পড়েন প্রিয়াঙ্কা। প্রশাসনের দাবি, ১৪৪ ধারা চলছে সনভদ্রে। তাই সেখানে কোনো রাজনৈতিক দল যাওয়া মানেই পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। প্রিয়াঙ্কা অভিযোগ করেছেন, এই নির্দেশ সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রই দেখাতে পারেনি পুলিশ। যদিও মির্জাপুরের জেলা শাসক অনুরাগ পটেল বলেছেন, ১৫১ সিআরপিসিতে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

"