সংসদ অধিবেশনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

একাদশ জাতীয় সংসদের ‘সংসদ অধিবেশন’-এর প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। বিএনপির এমপিরা শপথ নিয়ে সংসদে ফেরার কারণেই মূলত মানুষের আগ্রহটা বেড়ে যায়। বলা যায়, চলতি সংসদের প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশনের চেয়ে তৃতীয় অধিবেশনটি বেশি কার্যকর হয়েছে। এ অধিবেশনটির কার্যকাল ছিল ২১ দিন। এটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের এ মেয়াদের প্রথম বাজেট অধিবেশনও। বাজেটের আকার ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটির বেশি।

দশম জাতীয় সংসদটি বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বর্জন করায় ওই সংসদটি নিয়ে খুব একটা আলোচনা ছিল না। তবে সমালোচনা ছিল। কারণ সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তফাত না থাকায়, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ

ইস্যুতে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। টানা তিনটি সংসদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে অংশ নেয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। এবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নিলেও আসন বিবেচনায় তাদের অবস্থান দাঁড়ায় তলানিতে। অর্থাৎ সর্বসাকল্যে সংরক্ষিতসহ এমপির সংখ্যা সাতজন। কম আসন পাওয়ায় একাদশ সংসদে তাদের এমপিরা শপথ নেবেন না, এমন সিদ্ধান্তে অটল থাকেন তারা। এমনকি বর্তমান সংসদকে তারা অবৈধ আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক মঞ্চে জোর বক্তব্য দিতে থাকেন। তবে জনসমর্থন আদায় করে রাজনৈতিক মাঠ গরম করতে পারেনি দলটি।

এভাবে বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনটি বিএনপির এমপি ছাড়ায় শেষ হয়। ওই অধিবেশনের কার্যদিবস ছিল ২৬ দিন। পরে দ্বিতীয় অধিবেশনের মেয়াদ ছিল পাঁচ কার্যদিবস। এ অধিবেশনে যোগ না দিলে বিএনপির সব এমপির আসন শূন্য হয়ে যেত। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিএনপির জাহিদ হোসেন গোপনে শপথ নেন। দলে সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে বিএনপি।

পরে লন্ডনে নির্বাসনে থাকা দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের বিপর্যয় ও দলকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে বাকি চারজনকে শপথ নিতে পরামর্শ দেন। তবে, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ না নেওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। সংশ্লিষ্ট ওই আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী কাজী সিরাজ এমপি হয়ে শেষ হওয়া অধিবেশনের শেষ কর্মদিবসে শপথ নিয়েছেন।

দ্বিতীয় অধিবেশনের শেষ কর্মদিবসে বিএনপির এমপিরা শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন। শুরুতে বিএনপির সংসদীয় গ্রুপের নেতা হারুনুর রশীদ এমপি জ্বালাময় বক্তব্য দিয়ে নিষ্প্রাণ সংসদকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। পরে তৃতীয় অধিবেশন শুরুর আগে সংরক্ষিত আসনে ভাষাসৈনিক অলী আহমেদের একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে এমপি হিসেবে মনোনীত করেন। এতে সংখ্যা বিবেচনায় এমপি কম হলেও মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে বিএনপি শেষমেশ সংসদে ফেরায়।

গত ১১ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। প্রথম কর্মদিবসে বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা এমপি রুমিন ফারহানা তথ্য-উপাত্তভিত্তিক প্রাণবন্ত বক্তব্য দেন। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শহরের গ-ি পেরিয়ে গ্রামের ইউনিয়ন পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এরপর বাজেট আলোচনায় সুযোগ পেয়ে ১৫ মিনিট ধারালো বক্তব্য রেখে সংসদকে মানুষের দেখার আগ্রহের জায়গায় নিয়ে যান এই এমপি। এর আগে বিভিন্ন টিভি টকশোতে সরব উপস্থিতি ছিল রুমিন ফারহানার; সেখান থেকেই তার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেশি তৈরি হয় বলে জানান কয়েকজন সাধারণ নাগরিক।

তবে, সংসদের দশম ও একাদশ সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে থাকলেও বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের তুলনায় সরকারি দলের মন্ত্রীরা নিজ দলের এমপিদের সমালোচনার মুখে ছিলেন। তবে, জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্যরা দশম সংসদে মন্ত্রিসভায় থাকায় ওই সংসদটি অনেক বেশি নিষ্প্রাণ ছিল। তবে, একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি কিংবা শরিক দলগুলো থেকে কাউকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মন্ত্রিসভায় রাখেননি। ফলে বিএনপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং জাসদের হাসানুল হক ইনু সরকারের বিভিন্ন কর্মকা-ের সমালোচনায় সংসদকে প্রাণবন্ত করে রেখেছেন। তবে, জাতীয় পার্টির সদস্যরা সে অর্থে নীরব দশমের ভূমিকা পালন করে চলেছে।

সদ্য শেষ হওয়া সংসদ অধিবেশনের প্রশ্নোত্তরে সারা দেশের হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বিএনপির এমপি হারুনুর রশীদ ও রুমিন ফারাহানা কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য দেন। এতে সরকারি দলের মন্ত্রী তার বক্তব্যে যতটা না কঠোর ছিলেন, তার চেয়েও বেশি বিএনপির এমপিদের বক্তব্যের সমালোচনায় সোচ্চার হন জাতীয় পার্টির এমপি কাজী ফিরোজ রশিদ।

একপর্যায়ে বিএনপির সংরক্ষিত এমপি রুমিন ফারহানা পরে আরেকটি ইস্যুতে ফ্লোর পেয়ে বলতে বাধ্য হন, ‘আমি এমন এক সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, যেখানে কে সরকারি দল কে বিরোধী দল তা আমি বুঝি না।’ এসব নানা গঠনমূলক বক্তব্য ও সরকারের ত্রুটি নিয়ে কথা বলায় বর্তমান সংসদ দেখার প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। এবার সংসদে তিনটি বিল পাস হয়েছে; একটি বিল উত্থাপন হয়েছে। বাজেট আলোচনায় সর্বোচ্চ সংখ্যা প্রায় ৩০০ জন এমপি কথা বলেছেন। আলোচনা হয়েছে ৫৫ ঘণ্টার মতো।

 

"