রোহিঙ্গারা এখন স্থানীয়দের আতঙ্ক

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে ৩২টি ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গারা এখন স্থানীয়দের কাছে আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। ইয়াবা, মানব পাচার ও রোহিঙ্গা শিবির তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে উখিয়া-টেকনাফের এর অভ্যন্তরে একাধিক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আধিপত্য বিস্তারে তাদের মধ্যে বাড়ছে হামলা, সংঘর্ষের ঘটনা। চলছে অস্ত্রের মহড়াও। চলতি বছরের ৭ জুন পর্যন্ত তাদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে খুন হয়েছেন ৩৮ রোহিঙ্গা। বাড়ছে অপহরণ, ধর্ষণসহ নানা অপরাধও। এ ছাড়া অনেক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ প্রতিদিন ক্যাম্প ছাড়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। জানা যায়, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় সাত লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে গত তিন দশকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে আরো প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে মানবিক আশ্রয় পেয়েছে। উখিয়া পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে রয়েছি আমরা। মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই মানবিকতার কারণেই এখন নানা ঝুঁকিতে পড়েছি আমরা স্থানীয়রা। দ্রুত এই সংকটের সমাধান হওয়া উচিত। রোহিঙ্গাদের মধ্যে আছে এইডস আক্রান্ত রোগী। সেই সঙ্গে রয়েছে কলেরার সমস্যাও। একই সঙ্গে তারা গাছ কেটে বন উজাড় করছে, পাহাড় কেটে ধ্বংস করছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকিও আছে এর সঙ্গে। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাও প্রকট হতে পারে, বাড়তে পারে নিরাপত্তা ঝুঁকিও। সব মিলিয়ে এ সমস্যাগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটি ঠিক করাই এখন আমাদের দেশের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সদস্য নুর মোহাম্মদ সিকদারও ঠিক একই সুরে বলেন, বিশ্ববাণিজ্যের অংশ হিসেবে এনজিওরা রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছে। এনজিও কর্তারাও বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। সম্প্রতি এনজিওর গাড়িতে করে ইয়াবা পাচারের বিষয়টি নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে ঝুঁকির নানা দিক বিশ্লেষণ করে তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে আছে এইডস ও স্বাস্থ্যঝুঁকি, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি, পর্যটনে ধস নামার আশঙ্কা, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং পাহাড়-বনের অপূরণীয় ঝুঁকি। ক্রমেই এসব ঝুঁকির বিষয় প্রকট হতে চলেছে। রোহিঙ্গারা দেশের সর্বত্র এমনকি বিদেশেও যেতে চাইছে। ক্যাম্প ত্যাগ করে নানাভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত বা জেলার চেকপোষ্টগুলোতে আটক হয়ে গত দেড় বছরে প্রায় ৫৬ হাজার রোহিঙ্গাকে ক্যাম্প ফেরত আনা হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করছে।

স্থানীয়রা মনে করছেন, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের আবাসন এলাকায় নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় তারা অনায়াসে ক্যাম্প থেকে যখন তখন বের হচ্ছে। এভাবে নানা উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। কোনোভাবে দেশের আনাচে-কানাচে তারা ভিত গাড়তে পারলে জড়াতে পারে নানা অপরাধেও। তা ছাড়া তাদের আইডেনটিটি না থাকায় অপরাধ করে সহজে আত্মগোপনে যেতে পারার সম্ভাবনা শতভাগ।

এ বিষয়ে উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের বলেন, দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। ক্যাম্প এলাকায় কাঁটাতারের সীমানা বেষ্টনী তৈরির প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে তিনি মত দেন।

আবার স্থানীয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদ নেতাদের ভাষ্য, মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত ও ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পিতভাবে শিবিরগুলোকে অস্থিতিশীল করে তোলা হচ্ছে। পুলিশসহ স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, টেকনাফ ও উখিয়ার শিবিরে সাতটি করে সন্ত্রাসী বাহিনী আছে। এর মধ্যে টেকনাফের আবদুল হাকিম বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিপণ আদায়ের জন্য যখন-তখন লোকজনকে অপহরণ করে। মুক্তিপণ না পেলে হত্যা করে লাশ গুম করে। ইয়াবা, মানব পাচারে যুক্ত থাকার পাশাপাশি এ বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গা নারীদের তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটায়।

পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৭ জুন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে প্রায় ৩৮ জন রোহিঙ্গা। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৬, মার্চে ১০, এপ্রিলে ৪, মে মাসে ৫ জন ও ৭ জুন পর্যন্ত ৫ জন। টেকনাফ পুলিশের ভাষ্য, ৩৮ রোহিঙ্গার মধ্যে পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ২১ জন। নিহতদের অধিকাংশ ইয়াবা কারবারি ও মানব পাচারকারী। মাদকের পাশাপাশি নারীদের ওপরও নানা অত্যাচার করছে রোহিঙ্গা অপরাধীরা।

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম জানান, উখিয়া-টেকনাফের ৩৪ টি আশ্রয় শিবিরে পুরোনো-নতুন মিলিয়ে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৯১৩ জন। তালিকাভুক্ত প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবনধারণ পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের দেওয়া অনেক পণ্য তারা বাজারে বিক্রিও করে দিচ্ছে। এরপরও গোপনে বা কৌশলে ক্যাম্প ছাড়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে রোহিঙ্গারা। অপরাধে জড়ানোর বিষয়ে প্রত্যাবাসন কমিশনার বলেন, যেসব রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধ বেড়েছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলও বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও।

"