নারী ও শিশু সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

বদরুল আলম মজুমদার

ধর্ষণ, এসিড হামলা ও ধর্ষণপরবর্তী হত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে সামাজিক অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। এসব ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় দেশের সাধারণ মানুষও ব্যাপকভাবে উদ্বিগ্ন। সেই সঙ্গে গত কয়েক দিনে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে উঠে আসা খবরগুলো মানুষকে যেমন আঘাত করেছে, আবার মানবাধিকারের দিক বিবেচনায় নিয়ে অনেক সংগঠন তাদের উদ্বেগের কথাও জানিয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য মতে দেখা গত ৫ বছরে ২৩১৩৯ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া গত ৬ মাসে সারা দেশে ২০৮৩ জন নারী ও শিশু হয়রানির শিকার হয়েছেন।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ঢিলেঢালা মনোভাব, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, মাদকাশক্তি ও নিরাপত্তা সচেতনতার অভাবের কারণেই মূলত এসব অপরাধ বাড়ছে। মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, সমাজ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ বিদায় নেওয়ার কারণেই মূলত এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। নারীদের সামাজিক সহঅবস্থান এখন আগের মতো নেই। তাই এ জাতীয় অপরাধের প্রবণতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর বাইরে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে যথাযথ সহায়তা বা সুরক্ষা না পাওয়াও এর অন্যতম কারণ।

বিশেষজ্ঞরা এমন ঘটনাকে একদিকে দেশের একটি শ্রেণির মানুষের নৈতিক, মানসিক ও সামাজিক চরম অবক্ষয় বলে মনে করছেন, অন্যদিকে দেশের শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা বিবেচনা করছেন। যারা এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়নি তারাও প্রতি মুহূর্তে মানসিক শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা নিয়ে বেড়ে উঠছে বলে বলছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সময়মতো সুবিচারের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজে নারীর প্রতি সম্মানবোধ বৃদ্ধির সচেতনতা বাড়াতে আরো কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন অনেকে। মনোবিদ অধ্যাপক ড. মেহতাব খানম বলেন, আমরা যেমন অনেক দিক থেকে উন্নতি-উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি, তেমনি সামগ্রিকভাবে একটি মানসিক-সামাজিক অধপতন ও অবক্ষয়ের মধ্য দিয়েও যাচ্ছি। পরিবার-শিক্ষা-রাজনীতি-আদর্শ সব জায়গাতেই এর কালো ছায়া আছে। সবাই যখন অর্থবিত্তের দিকে ঝুঁকে পড়ে তখন এর আড়াল দিয়ে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় বড় হয়ে ওঠে। সে অবক্ষয় এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে অসুস্থ যৌনতা ও মানসিক বিকারগ্রস্ততাও জাগ্রত করছে। নারীর প্রতি সম্মানের জায়গাকে তারা মোটেই মূল্যবোধ দিয়ে দেখতে পারে না; যার অন্যতম বলি হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, অপ্রিয় হলেও সত্যি যে আমাদের দেশে অবাধে স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করার সক্ষমতা হয়নি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাবও বড়ভাবেই পড়ছে। আবার অনেকে যৌনশিক্ষার বিষয়কে উৎসাহিত করলেও এর নেতিবাচক দিক নিয়েও ভাবনার অবকাশ রয়েছে। চীন-থাইল্যান্ডের মতো উন্মুক্ত সংস্কৃতির দেশই এখন রক্ষণশীলতার পথ খুঁজতে শুরু করেছে নতুন প্রজন্মকে রক্ষার জন্য।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক নির্বাহী পরিচালক সালমা বলেন, পুলিশ স্টেশন ও সংশ্লিষ্ট আদালতগুলো এখনো নারীবান্ধব নয়। তাছাড়া নারী সহায়তা কেন্দ্রের সংখ্যাও খুব কম। তাই সঠিক সহায়তার অভাবে অপরাধ করেও বেশিরভাগ অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে আদালত সহজেই জামিন দিয়ে দেয়। যা হওয়া ঠিক নয়। এর বাইরে শাস্তির পরিমাণ দেখে অপরাধীরা অনেক সময় উৎসাহিতও হয়। তাছাড়া ব্যক্তির অন্য সামাজিক গ্রাউন্ড বিশেষ করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে অপরাধীরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবহেলার কারণেই অপরাধীরা বেশি আশকারা পায়। অপরাধ করেও বিনা সংকোচে ঘুরে বেড়ায়, কেউ তাদের ধরার সাহস পায় না।

তবে মানবাধিকার কর্মী সালমা আলী পরামর্শ দেন নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা হ্রাসের জন্য সচেতনতার মাধ্যমে দ্রুত ও সঠিক শাস্তি নিশ্চিত করতে এবং নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের (বিএমপি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নারী, বিশেষ করে ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। তাদের পরিসংখ্যান মতে, গত বছর ৯৪২ জন মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। গত বছরের তুলনায় এ বছর নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৩,৯১৮টি। সেই হিসেবে এই বছরের প্রথম ছয় মাসে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২,০৮৩টি।

বিএমপি দেওয়া গত ৫ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে কমপক্ষে ২৩,১৩৯ জন নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩,৯১৮ নারী গত বছর সহিংসতার শিকার, ২০১৭ সালে ৫,২৩৫, ২০১৬ সালে ৪,৮৯৬, ২০১৪ সালে ৪,৪৩৬ এবং ২০১৪ সালে ৪,৬৫৪ জন নারী। এর মধ্যে ৯৪৫ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর ৩৪৯ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে।

রিপোর্টে আরো বলা হয়, গত পাঁচ বছরে যৌতুকের কারণে ৮৯৪ জন নারী মারা গেছে। তাদের মধ্যে ২০১২ সালে ১০২, ২০১৭ সালে ১৮১, ২০১৩ সালে ১৭৩, ২০১৫ সালে ২০২২ এবং ২০১৪ সালে ২৩৬ জন ছিল।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অপর একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৮৯৫টি শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০৩টি শিশু খুন হয়েছে। ওই তথ্য অনুসারে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারী ও শিশুদের মধ্যে ১৮ বছর বয়সের নিচের শিশু-কিশোরীরাই বেশি। যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০২ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছর, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়স ৯৭ জনের, অনূর্ধ্ব ছয় বছর বয়স ৫৯ জনের। আর বড়দের মধ্যে ধর্ষণের শিকার ১৯ থেকে ২৪ বছর ২৭ জন, ২৫ থেকে ৩০ বছরের ১৬ জন এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সির সংখ্যা ১৭। যদিও এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হচ্ছে ৩১২ জনের বয়স যেমন প্রকাশ করা হয়নি আবার মোট ৬৩০টি ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৪৩২টি।

ধর্ষণের পর যাদের খুন করা হয়েছে তাদের মধ্যেও শিশুরাই বেশি। বিশেষ করে ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে অনূর্ধ্ব ছয় বছর বয়সের পাঁচজন, সাত থেকে ১২ বছর বয়সের সাতজন এবং ১৩ থেকে ১৮ বছরের ৯ শিশুকে। অন্যদিকে ধর্ষণের পর খুন হওয়া বড়দের মধ্যে ১৯ থেকে ২৪ বছর বয়সের দুজন, ২৫ থেকে ৩০ বছরের দুজন এবং ৩০ বছরের ওপরের বয়স চারজনের।

 

"