ঢাকা শহরে রিকশার ভবিষ্যৎ কী

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, রাজধানীর মূল সড়কগুলোতে রিকশা চলাচল বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। তিনটি সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে গতকাল বুধবারও ঢাকার কিছু এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছেন রিকশা চালকরা।

কয়েক দিন ধরেই ঢাকা শহরে রিকশা চলাচল করা উচিত কি না তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে পুরনো একটি বিতর্ক আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে শাহবাগ, খিলক্ষেত থেকে রামপুরা হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত সড়কে এবং মিরপুর রোডে রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর থেকে এই বিতর্ক। গত রোববার থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা শুরু হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি।

যানজট নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি একটি কমিটি গঠন করেছে। সেই কমিটির প্রধান ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি বলছেন, অলিগলি বাদ দিয়ে মূল সড়কগুলো থেকে ধীরে ধীরে রিকশা তুলে দেওয়া হবে।

তিনি বলেছেন, ‘ঢাকা শহরের বর্তমান যা অবস্থা আমরা যদি ধীরে ধীরে এই অবস্থার পরিবর্তন না করি, একটা শহর তো থমকে থাকতে পারে না। আমরা জানি যে এ ধরনের উদ্যোগে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা আসবে কিন্তু আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে আমাদের কাজগুলো আমরা করব।’ কিন্তু ঢাকা শহর থমকে থাকার জন্য রিকশাই কি শুধুমাত্র দায়ী? যানবাহন বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহউদ্দিন বলেন, ‘রিকশা একা দায়ী না হলেও সড়কে ধীরগতির যানবাহন চলাচল করলে শহরের গতি বাধাগ্রস্ত হয়। রিকশার জন্য কোনো গাড়ি নির্দিষ্ট গতিতে চলতে পারে না। সে একটা লেনে চলে না।’ তিনি আরো বলছেন, দুটি সিটি করপোরেশনকে ঠিক করতে হবে ঢাকায় কত রিকশা প্রয়োজন। তিনি বলেন, কলকাতার উদাহরণকে ঢাকায় ব্যবহার করতে হবে।

অন্যদিকে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমাদের রাজধানী শহরে মানবচালিত রিকশা, যেটা পৃথিবীর কোনো রাজধানী শহরে নেই, সেটা থেকে একটা না একটা সময়ে আমাদের বের হয়ে আসতেই হবে।’

তিনি বলেন, সেটি নিয়ন্ত্রণের জন্য এখন তিনটি সড়কে রিকশার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ঢাকায় ৯০-এর দশক পর্যন্ত সব সড়কে রিকশা চলত। শুরুতে ভিআইপি রোড তারপর মিরপুর রোড থেকেও রিকশা তুলে দেওয়া হয়। নতুন করে এই তিনটি সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যানজট নিরসনে মেট্রোরেল নির্মাণকাজ চলছে। এই প্রকল্পকাজের কারণে দক্ষিণ ও উত্তরে মূল যে ভিআইপি সড়ক রয়েছে, যেটি দক্ষিণ ও উত্তর সিটিকে যুক্ত করেছে, সেখানে রাস্তা মারাত্মক সরু হয়ে গেছে। যার কারণে প্রচ- যানজট হচ্ছে।’

কিন্তু রিকশা না থাকায় কিছু এলাকার বাসিন্দারা ব্যাপক ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন। ঠিক যে সময়টিতে অফিস বা স্কুলের উদ্দেশে তারা রওনা দেন, তখন বেশ লম্বা সময় ঢাকার প্রগতি সরণিসহ আশপাশের কিছু সড়ক অবরোধ করেছিলেন রিকশাচালকরা। রামপুরা, বাড্ডা, নতুন-বাজার, খিলগাঁওসহ বেশ কিছু এলাকায় বহু মানুষকে হেঁটে তাদের গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। বাসাবোর কদমতলা এলাকার জলি আক্তার তার ভোগান্তির বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আজকে ছেলে স্কুলে যেতেই পারেনি। আর মেয়ে কলেজে গেছে। কিন্তু সে এখনো আসেনি। একটু আগে জানাল হেঁটে হেঁটে আসছে।’

তিনি বলেন, কোনো বিকল্প ছাড়া হঠাৎ রিকশা তুলে দিলে খুব বিপদে পড়ে যাবেন তিনি ও তার পরিবার। ‘রিকশা ছাড়া আমরা চলতে পারব না। আমাদের এদিকে কোনো বাস নেই। বিকল্প ব্যবস্থা একটা করতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা না করে রিকশা উঠিয়ে দিলেই তো চলবে না।’

মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘বিকল্প হিসেবে আমরা বাস সার্ভিসকেই উৎসাহিত করছি। আমরা চক্রাকারে বাস সার্ভিস চালু করেছি। মেট্রোরেল যখন চালু হয়ে যাবে, তখন আমাদের অনেক সুবিধা হবে। ধীরে ধীরে কম পয়সায় ভালো সার্ভিস দিয়ে, রিকশা নিরুৎসাহিত করতে চাই।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ বা বিলস সম্প্রতি এক গবেষণার পর বলছে ঢাকায় রিকশার সংখ্যা ১১ লাখের মতো। দিনে একটি রিকশা দুই শিফটে চলে। এর চালকের সংখ্যা সে হিসাবে আনুমানিক ২২ লাখের মতো। এত মানুষের জন্য বিকল্প ভাবা দরকার বলে মনে করছেন বিলসের পরিচালকদের একজন কোহিনুর মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘যেকোনো শ্রমজীবী মানুষ হোক না কেন, তার পেশা থেকে তাকে যদি সরিয়ে নিতে হয়, তাহলে তাকে সময় দিতে হবে। আমরা সেøাগান দিচ্ছি কেউ পেছনে পড়ে থাকবে না কিন্তু আবার আমরা একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে পেছনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছি। আমাদের আবার গ্রামীণ অর্থনীতিতে ফিরে যেতে হবে। এরা মূলত খ-কালীন রিকশাচালক। তারা যেন গ্রামেই কাজ করতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।’

যানবাহন বিশেষজ্ঞ ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ‘রিকশাওয়ালাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলে তো হবে না। ধরুন ঢাকায় যদি প্রচুর পাবলিক বাস চালু হয়, সেখানেও বহু লোক লাগবে, কর্মসংস্থান হবে। এসব বাসে তাদেরই তো প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগানো যায়।’

 

 

"