ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতুতে বাঁশ কাঠের জোড়াতালি

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বছরের পর বছর সংস্কার না করার কারণে ৩ হাজার ৩৮০টি ছোট-বড় সেতুর মধ্যে ৩২৭ রেলসেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এ সেতুগুলো দিয়ে ট্রেন চলছে ধীরগতিতে।

খোদ ঢাকার দয়াগঞ্জে রেলসেতুতে অনেকদিন ধরেই ভাঙ্গা অবস্থায় রয়েছে কয়েকটি সিøপার। এছাড়া সিøপার ও লাইনে পাতের কোথাও কোথাও নাটও নেই। নড়বড়ে সিøপার ঠিক রাখতে তাই ব্যবহার করা হচ্ছে বাঁশ। এছাড়া সিলেট থেকে চট্টগ্রাম ও ঢাকার রেলপথে বিভিন্ন স্থানে সেতুর অবস্থা জরাজীর্ণ। অনেক স্থানে সিøপারের নাট-বল্টু নেই। ঢাকার দয়াগঞ্জ রেলসেতুতে কাঠের সিøপারগুলোর বেহাল অবস্থা। খসে পড়েছে সিøপারের কাঠ। আর সিøপারগুলো শক্ত রাখতে স্টিলের পাতের বদলে লাগানো হয়েছে বাঁশের ফালি! এই ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়েই চলছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে রেল যোগাযোগ।

বর্তমানে দেশের ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেলপথে ৪৭৭ বড় সেতু (৬০ ফুট বা তার বেশি) এবং ছোট সেতু রয়েছে ২ হাজার ৯০৩। তবে এসব সেতুর অধিকাংশেরই নির্মাণকাল ব্রিটিশ আমলের হওয়ায় সেতুগুলোর বয়স বর্তমানে ৮০ থেকে ১০০ বছর। বেশির ভাগ সেতু নির্মাণ করা হয় ১৯৩০ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে। সেতুগুলো নির্মাণের পর স্বাধীনতার আগ থেকে পর পর্যন্ত কোন সরকারই এসব সেতু সংস্কার বা নির্মাণের বড় আকারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। উপরন্তু রেল কর্তৃপক্ষ ট্রেনচালকদের এসব ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম গতিতে ট্রেন চালানোর নির্দেশ দিয়েছে। তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ দেশের ঝুঁকিপূর্ণ সব রেলসেতু সংস্কারের নির্দেশনা দিয়েছেন। গত ২৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এ নির্দেশনা দেন তিনি। ঢাকা-সিলেট রুটে রেলের বগি পড়ে হতাহতের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী দেশের সব রেলসেতু জরিপ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। জরিপের মাধ্যমে যেসব সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উঠে আসবে, সেগুলো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নিতে বলেছেন।

রেল কর্মকর্তাদের মতে, গত দুই দশক ধরে এসব সেতু সংস্কার না করায় অতিবৃষ্টি বা প্রবল বন্যায় ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো ভেসে বা দেবে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ার পাশাপাশি ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এসব সেতুতে ট্রেন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হয়। ফলে চলাচলের জন্য স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে অনেক বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়। ফলে প্রতিদিনই শিডিউল বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। যাত্রাপথে যাত্রীদের হয়রানি হতে হচ্ছে। তাছাড়া ট্রেন সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না বিধায় যাত্রীদের মূল্যবান লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, পাশপাশি কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে। যার প্রভাব সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে পড়ছে।

জানা গেছে, সারা দেশে রেলওয়ের মোট ৩ হাজার ৩৮০ সেতুর মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল মিলে ৩২৭টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ৭৭ বড় সেতু (যেগুলোর দৈর্ঘ্য ৬০ ফুট বা তার বেশি) ঝুঁকিপূর্ণ। ছোট সেতু ২৫০ ঝুঁকিপূর্ণ। বেশি ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতুগুলো ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ২২ বড় ও ৭৬ ছোট সেতু ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া ভৈরব-নরসিংদী অংশে ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে ৪ বড় ও ২৪ ছোট সেতু, ভৈরব-আঠারোবাড়ী অংশে একটি বড় ও ১৭ মাইনর, টঙ্গী-নরসিংদী অংশে দুটি বড় ও ১৯ ছোট, টঙ্গী-শ্রীপুর অংশে ৪ বড় ও ৩৯ মাইনর, শ্রীপুর-ময়মনসিংহ অংশে ৭ ছোট, আঠারোবাড়ী-ময়মনসিংহ অংশে একটি বড় ও ১০ ছোট এবং ময়মনসিংহ-গৌরীপুর অংশে দুটি বড় ও ৮ ছোট সেতু ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম সিলেট রুটে ৪৩ বড় ও ৫২ বড় সেতু ঝুঁকিপূর্ণ।

রেল কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর দেশের কোনো কোনো রেলসেতু ঝুঁকিপূর্ণ তা চিহ্নিত করতে বিশেষ জরিপ কার্যক্রম সম্পন্ন করে। তবে জরিপের ফলের ওপর ভিত্তি করে গত কয়েক বছরেও কোনো সেতু সংস্কারের কার্যক্রম হাতে নেয়নি। রেলসেতুর প্রায় সবগুলোই ব্রিটিশ আমলে তৈরি হওয়ায় বর্তমানে এসব সেতু অনেকটা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সেতুগুলোর প্রায় সবগুলোই ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি। সে সময় মজবুত সেতু নির্মাণে সিমেন্টের ব্যবহারের প্রচলন না থাকায় সব গাঁথুনি করা হয় চুন সুরকির সাহায্যে।

ঝুঁকিপূর্ণ এসব সেতুর বড় একটি অংশ বর্তমানে নড়বড়ে। তবে সেতুগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই। এসব সেতুতে লোকাল অথবা আন্তঃনগর ট্রেন চলার সময় গতি অত্যন্ত কমিয়ে ট্রেন চালানোর নির্দেশ দেওয়া রয়েছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে যে কোনো সময় এসব সেতুতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। গত দুই বছরে প্রবল বর্ষণ ও বন্যায় কয়েকটি সেতু ভেসে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

রাজবাড়ী : রেললাইনের বিভিন্ন স্থানে নেই সিøপার ও নাট-বল্টু। আবার রেলসেতুতে লোহার পাত দিয়ে মেরামতের কথা থাকলেও বাঁশ দিয়ে করা হয়েছে সংস্কার।

এলাকাবাসী জানায়, রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া রুটের রাজবাড়ীর চান্দনা এলাকায় ব্রিটিশ আমলে তৈরি রেলসেতুর সিøপার রক্ষায় লোহার পাত দেওয়ার কথা থাকলেও ব্যবহার করা হয়েছে বাঁশ।

শুধু চান্দনা সেতু নয়, এ রুটের ছোট বড় অনেক সেতু কাঠের সিøপার আটকানো লোহার নাটের বদলে আটকানো হয়েছে বাঁশের পেরেক দিয়ে। নাট ধরে রাখতে বাঁধা হয়েছে সুতলি দিয়ে।

সেতুর চারটি নাট-বল্টুর স্থানে দেওয়া হয়েছে দুটি। এমনকি গোয়ালন্দ-কুষ্টিয়া, কালুখালী-ভাটিয়াপাড়াসহ তিনটি রুটের ৬২টি ব্রিজে ব্যবহার করা হয়েছে কাঠ।

 

"