চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসন

শিগগিরই খাল খনন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

মাঠে নামছে সেনাবাহিনী

প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৯, ০০:০০

মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম

অবশেষে চট্টগ্রামের নগরবাসীর জলাবদ্ধতার নিরসনে মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী মাসের শুরুতে সেনাবাহিনীর তদারকিতে খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে বলে সূত্র জানায়। পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণের কাজও চলবে।

সামান্য বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগরের অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। দীর্ঘদিনের এই সমস্যা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত করা হয় সেনাবাহিনীকে।

এদিকে উচ্ছেদ অভিযানের পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সম্মেলন কক্ষে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বৈঠক হয়। সিডিএর চেয়ারম্যান এম জহিরুল আলম দোভাষের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এ মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ (চসিক) সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা। সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান জুলাইয়ের প্রথমদিকে শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়। তবে উচ্ছেদ অভিযানের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আগে বৈঠক করেই উচ্ছেদে হাত দেওয়া হবে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় চলমান উচ্ছেদ ও অধিগ্রহণে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছেন প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেনাবাহিনীর ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের মহাপরিচালক। প্রথম পর্যায়ে ১৩টি খালের ওপর এবং আশপাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ভূমি অধিগ্রহণ কাজ শিগগিরই শুরু করা হবে। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের সময়ক্ষেপণ হবে না।

সিডিএর সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার নিরসনে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনর্খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন শীর্ষক’ ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার এ মেগা প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পটিকে রাজনীতিবিদরা বর্তমান সরকার কর্তৃক চট্টগ্রামবাসীকে দেওয়া উপহার হিসেবে দেখছেন। সিডিএ সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি ২০১৭ সালে একনেকে পাস হয়। প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয় ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুন। প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মো. শাহ আলী বলেন, পরামর্শ প্রতিষ্ঠান ‘সিইজিআইএস’ এর দেওয়া ডিজাইন, ড্রইং অনুযায়ী আমরা প্রথম পর্যায়ে ১৩টি খাল নিয়ে কাজ করছি। খালগুলোর পাশে রিটেইনিং ওয়াল হচ্ছে।

তিনি বলেন, এরই মধ্যে বিএস জরিপ অনুযায়ী খালের আদি নকশা সংগ্রহ এবং কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান নকশা প্রণয়ন চলছে। এরপর সিডিএ ডিমার্কেশন করবে।

সিডিএর পক্ষে একই প্রকল্পের পরিচালক নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দিন বলেন, আগামী জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার প্রতিনিধির নিয়ে সেনাবাহিনী খালগুলোর ওপর অবৈধ উচ্ছেদে নামবে। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে খালের আবর্জনা অপসারণের মধ্য দিয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এরই মধ্যে মেগা প্রকল্পের আওতায় নগরীর এ কে খান এলাকায় খালের ওপর একটি পাওয়ার স্টেশনের বর্ধিত অংশ ভাঙা এবং পাঠানটুলি এলাকায় একটি খালের ওপর কয়েকটি দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং খালগুলো খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিন ধাপে খালগুলো খনন ও সংস্কার করা হবে। প্রথম দফায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১৩টি খালের খননকাজ চলছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১০টি এবং শেষ পর্যায়ে বাকি খালগুলো থেকে মাটি উত্তোলন করা হবে। খাল খনন ও সংস্কারের পর প্রতিরোধ দেয়াল তৈরি করে খালের পাড়ে ১০ ফুট করে রাস্তা করা হবে। সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরু হয় জলাবদ্ধতা দূর করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজগুলোকে ভাগ করা।

এসব প্রকল্প করতে গিয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পরিষ্কার করা নালা-খালে পুনরায় আবর্জনা ফেলে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করাসহ মাঠ পর্যায়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এগুলো সমাধান করে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হবেন আশা করছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা।

এ ব্যাপারে গত ৪ মে শনিবার সকালে ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনর্খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন শীর্ষক’ মতবিনিময় সভায় ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী বলেন, যত্রতত্র ময়লা ফেললে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সচেতনতার জন্য র‌্যালি, মাইকিং কিংবা সমন্বয় করলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, অনেক খাল থেকে ময়লা অপসারণ করা হয়েছে। কিন্তু কিছু দিন পর আবারও খালগুলো ময়লায় ভরাট হচ্ছে। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা জরুরি।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী আরো বলেন, এজন্য সিডিএ, চসিক, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, ৪১টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের নিয়ে চার ধাপে বৈঠক করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে তাদের পরিকল্পনাগুলো জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ করে সেনাবাহিনী দায়িত্ব ছাড়বে।

প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন হবে, এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত ও জনগুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের ভৌত কাজগুলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড কর্তৃক সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

"