চট্টগ্রামে যত্রতত্র ইয়াবা

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০

চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামকে দেশের অভ্যন্তরে ইয়াবা পাচারের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক পাচারে জড়িতরা। সাম্প্রতিককালে প্রায় প্রতিদিনই কখনো র‌্যাব, কখনো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অভিযানে, আবার কোনো কোনো সময়ে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের হাতে ধরা পড়ছে মাদক পাচারে জড়িতরা। চট্টগ্রামে মাত্র গত এক সপ্তাহের গ্রেফতারের চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, এ ভয়ংকর নেশা ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত রয়েছে পুলিশ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থার সদস্য, ভুয়া সাংবাদিক, কারারক্ষী, হাজতি ও তথাকথিত এনজিও কর্মী। ইয়াবার ভয়াল থাবা এতদূর পৌঁছেছে যে পারিবারিকভাবে এ মাদক ব্যবসা চালাচ্ছে অনেকে। গতকাল সোমবার ভোরে গ্রেফতার হন ষাট বছরের এক বৃদ্ধ ও তার জামাইকে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গ্রেফতার শ্বশুর মো. ইউসুফ বাংলাদেশের মাদক সম্রাট হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত পরিবার সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির এলাকা কক্সবাজারের মাদকের স্বর্গ টেকনাফের হ্নীলা এলাকার জনৈক উলা মিয়ার ছেলে। পুলিশের তালিকাভুক্ত বদির সহযোগী ওই এলাকার আরেক কুখ্যাত ইয়াবা ব্যবসায়ী নুরুল হক ভুট্টোর দুটি বাড়ি গত মে মাসে ৩১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ পুলিশ জব্দ করেছে। ইয়াবা ব্যবসায় সর্বশেষ আটক শ্বশুর মো. ইউসুফ প্রকাশ ইউসুফ জালাল জামাই আবদুর রহিমের কাছে ১ হাজার ৯৬৫ পিস ইয়াবার চালান পৌঁছে দেওয়ার সময় গ্রেফতার হন। পরে তার দেওয়া তথ্যে জামাই আবদুর রহিম প্রকাশ বার্মাইয়া রহিমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ইউসুফ টেকনাফের হ্নীলা এলাকার উলা মিয়ার ছেলে এবং আবদুর রহিম লোহাগাড়ার সমদ আলী মুন্সীবাড়ির মো. ইউনুসের ছেলে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জামাই-শ্বশুর ইয়াবা পাচারের ঘটনাটি সম্পর্কে কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন জানান, আবদুর রহিমের স্ত্রীর ভাই আয়াছের কাছ থেকে ইয়াবা নিয়ে হালিশহর এলাকায় আবদুর রহিমের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল এলাকার সম্পর্কীয় শ্বশুর মো. ইউসুফ প্রকাশ ইউসুফ জালাল। স্টেশন রোড এলাকা থেকে কোতোয়ালি থানা পুলিশের হাতে গত রোববার রাতে গ্রেফতার হন ইউসুফ। এ সময় তার কাছ থেকে ১ হাজার ৯৬৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সোমবার ভোররাতে হালিশহর এলাকা থেকে আবদুর রহিমকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়েছে। গত ১৬ জুন রোববার গ্রেফতারকৃত নূর মোহাম্মদও কক্সবাজারের টেকনাফ থানাধীন লেদাপাড়ার হাসু মিয়ার ছেলে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার কামাল হোসেন জানান, কারা হাজতি নূর মোহাম্মদ সাতটি ছোট পুটলি বানিয়ে ৩৫০ পিস ইয়াবা নিয়ে আসে। তাকে সন্দেহ হলে টয়লেটে নিয়ে গিয়ে ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়। রোববার দুপুরে নূর মোহাম্মদ (১৯) নামে ওই হাজতি পায়ুপথে করে ইয়াবাগুলো কারাগারে নিয়ে আসে।

এদিকে গতকাল সোমবার চট্টগ্রামে ইয়াবাসহ গ্রেফতার পুলিশ কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমানকে দুই দিন হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটকে অনুমতি দিয়েছেন আদালত। চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মেহনাজ রহমান এ অনুমতি দেন।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন) মো. কামরুজ্জামান জানান, গ্রেফতার সিদ্দিকুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়েছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এসআই রাছিব খান। শুনানি শেষে আদালত দুই দিনের রিমান্ডে পাঠান। সিদ্দিকুরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সোমবার হেফাজতে নেওয়া হবে বলে জানান এসআই রাছিব খান। গত শুক্রবার রাতে নগরীর ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি এলাকা থেকে সিদ্দিকুর রহমানকে ১০ হাজার ইয়াবা ও ৮০ হাজার টাকা এবং মোটরসাইকেলসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। সিদ্দিকুর রহমান নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের টাউন উপপরিদর্শক (টিএসআই) হিসেবে বন্দর জোনে কর্মরত ছিলেন।

একইদিন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে মাদক সরবরাহের অভিযোগে গ্রেফতার কারারক্ষীসহ চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। চার আসামি হলো কারারক্ষী সাইফুল ইসলাম (২২), মাদক বিক্রেতা দিদারুল আলম মাছুম ওরফে আবু তালেব মাছুম (৩৫) ও আজিজুল ইসলাম জালাল (৩৬) এবং আলো বেগম (৩৫)। সোমবার চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম সারোয়ার জাহান এ আদেশ দেন।

সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত সিদ্দিকুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের পর কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট এ মাদক ব্যবসায় জড়িত রেলওয়ের থানায় কর্মরত উপপরিদর্শক বাবলু খন্দকারও এ ইয়াবার ব্যবসায় জড়িত বলে তথ্য পায়। এরপর ইউনিটের এসআই সঞ্জয় গুহ বাদী হয়ে সিদ্দিকুর ও বাবলুর বিরুদ্ধে নগরীর ডবলমুরিং থানায় মামলা করেন। পলাতক বাবলু খন্দকারকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।

ইয়াবাসহ গ্রেফতারের ধারাবাহিক ঘটনায় গত শনিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি থানার কদমতলী ফ্লাইওভারের ওপর একটি সিএনজি অটোরিকশায় তল্লাশি চালিয়ে কারারক্ষী সাইফুল ইসলামকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ সময় তার পকেটে ৫০ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। থানার ওসি মহসীনের বক্তব্য মতে, গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সাইফুল জানান, কারাগারে বন্দি ভয়ংকর সন্ত্রাসী নুর আলম ওরফে হামকা নুর আলমের জন্য নগরীর লালদিঘীর পাড় এলাকায় মাছুমের কাছ থেকে সাইফুল ৫০ পিস ইয়াবা সংগ্রহ করেছিলেন। হামকা নুরের নির্দেশে নগরীর হালিশহর কাঁচাবাজার এলাকায় লিটন নামে একজনকে ২ হাজার টাকার বিনিময়ে ১০ পিস ইয়াবা দেওয়ার জন্য যাওয়ার পথে সাইফুল ধরা পড়েন।

সাইফুলের এই বক্তব্য পাওয়ার পর মাছুমকে নগরীর এনায়েতবাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ

ওসি মহসীন জানান, কারাগারে মাদক সরবরাহকারী চক্রের সঙ্গে আরো কেউ জড়িত কিনা সেটা জানতে আসামিদের ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল। শুনানি শেষে আদালত একদিন মঞ্জুর করেছেন।

 

"