ডাক্তারদের আন্দোলনের চাপে মমতা

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০১৯, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

কলকাতায় জুনিয়র ডাক্তারদের ওপর হামলার ঘটনাতেও এবার একঘরে হয়ে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের ভাইপো আকাশ, পিসির সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করছেন প্রকাশ্যে। আর দলের মধ্যে, কলকাতার মেয়র তথা রাজ্যের পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম পর্যন্ত ডাক্তারদের আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল। একই পথে, মমতার দলের সাংসদ ডাক্তার কাকলি ঘোষ দস্তিদার। ফিরহাদ হাকিমের মেয়ে সাব্বা ডাক্তারির ছাত্রী। কাকলির ছেলে বৈদ্যনাথও তাই। ফলে পেশাগত কারণে যদি তারা মমতার বিরোধিতা করতে বাধ্য হন, তাহলেও তৃণমূল নেত্রীর বিপদ অন্য জায়গাতেও। দলের সাংসদ এবং সুপারস্টার দেব-শুভশ্রী পর্যন্ত আন্দোলনরত ডাক্তারদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অবস্থা এমন, রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে ডাক্তারির ছাত্রদের উদ্দেশে বাবা-বাছা বলে ফেসবুকে পোস্ট দিতে হয়েছে। আর জুনিয়রদের সমর্থনে শুধু গতকাল শুক্রবার কলকাতাসহ রাজ্যে অন্তত ৯৫০ জন ডাক্তার গণ-ইশতফা দিয়েছেন। প্রতি মুহূর্তে সংখ্যাটা লাফিয়ে বাড়ছে। অপর্ণা সেন, অনুপম রায়, কৌশিক সেন, অনিক ধরের মতো যে পরিবর্তনপন্থিরা আট বছর আগে বামফ্রন্টের বিরোধিতা করে রাস্তায় নেমেছিলেন, তারাই এখন জুনিয়র ডাক্তারদের পাশে।

এর মধ্যেই কলকাতার শিয়ালদাহ স্টেশনের কাছে এনআরএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘বহিরাগত তত্ত্ব’-তেই অনড় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার বীজপুরের সভা থেকেও বলেছেন, সেদিন জানেন কেএনআরএসে ভাষণ রাখছিল, গেট আটছিল? জানেন কেন বলেছি, বহিরাগত আছে? সেদিন এনআরএসে যে ছেলেটা বক্তব্য রাখছিল, খোঁজ নিয়ে দেখুন তার নাম দীপক গিরি। সে ক্যালকাটা হার্ট রিসার্চ সেন্টারে ১০ বছর ধরে চাকরি করছে। বলুন তো, সে কীভাবে এনআরএসের জুনিয়র ডাক্তার হয়? আরো বলেছেন, আমি বলিনি সবাই বহিরাগত। তবে কিছু বহিরাগত যে রয়েছে, সেটা আমি বলেছি। মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেছেন, খোঁজ নিয়ে দেখুন আপনারাই, ওই ছেলেটা কোন দলের হয়ে কাজ করে? তাহলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, আমি কেন ওই কথাগুলো বলেছি। এর আগে, বৃহস্পতিবার এসএসকেএমে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রোগী পরিজনদের সঙ্গে কথা বলার পর ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। বলেন, ৪ দিন ধরে রোগী পড়ে আছে। কয়েকজন মিলে তা-ব চালাচ্ছে। আমার মন্ত্রী গিয়েছেন, পুলিশ কমিশনার গিয়েছেন। যারা নাটক করছে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেব। বিজেপি-সিপিআইএম উসকানি দিচ্ছে। চিকিৎসার নামে শুধু হিন্দু-মুসলমান করা হচ্ছে। হাসপাতালে রাজনীতি বরদাস্ত করা হবে না বলে হুশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপরই পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ আন্দোলনরত চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেন রাজ্যের সব সিনিয়র ডাক্তারও, যা নিয়ে বিপদে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা। আর বৃহস্পতিবারের পর শুক্রবারও মুখ্যমন্ত্রী ‘বহিরাগত তত্ত্ব’-এ অনড়।

মমতার বিপদটা কোথায়, তা এখন স্পষ্ট সোশ্যাল মিডিয়ায়। আন্দোলনরত চিকিৎসকদের কাছে কাজ শুরু করার অনুরোধ জানিয়ে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম ফেসবুকে দুটি পোস্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন... ডাক্তার বাবুরা, সাধারণ মানুষের কাছে তো ভগবান। আর সেই ভগবানরা যদি কাজ বন্ধ রাখে, তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ বাঁচব কী করে। নিশ্চয়ই যারা ডাক্তার বাবুদের গায়ে হাত দিয়েছে, তাদের উচিত ছিল যদি চিকিৎসায় গাফিলতি সন্দেহ করতেন, তাহলে নির্দিষ্ট উপায়ে যেতে পারতেন তা না করে যারা ডাক্তার বাবুদের পেটান, তারা গণশত্রু এবং আদালতের কাছে দাবি থাকবে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিক, যাতে ভবিষ্যতে ডাক্তার বাবুদের গায়ে কেউ হাত দেওয়ার সাহস না পায়। বৃহস্পতিবারই আন্দোলনরত চিকিৎসকদের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে ফেসবুক পোস্ট করেন তার মেয়ে শাব্বা হাকিম। ফিরহাদকন্যা নিজেও পেশায় একজন চিকিৎসক। এদিকে, এনআরএস কা-ের জেরে রাজ্যজুড়ে বন্ধ হওয়া চিকিৎসা পরিষেবার জেরে তিন দিন ধরে প্রচ- হয়রানির শিকার রোগীরা। এই পরিস্থিতিতে রোগী হয়রানির জেরে হাইকোর্টে দায়ের একটি জনস্বার্থ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার রাজ্য সরকারের কাছেই জবাব চেয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট। প্রধান বিচারপতি টি বি রাধাকৃষ্ণন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন, চিকিৎসকদের বয়কট তুলতে কোনো অন্তর্বর্তী অর্ডার দেবে না হাইকোর্ট। এরপরই সরাসরি রাজ্য সরকারকে প্রশ্ন করে প্রধান বিচারপতি জানতে চান, চিকিৎসক মার খাওয়ায় কী ব্যাবস্থা নিয়েছে রাজ্য? গ্রেফতারের পরও বয়কট না উঠলে কী ব্যাবস্থা নিয়েছে রাজ্য সরকার? প্রধান বিচাপতি বলেছেন, ডাক্তারদের মারধর দুঃখজনক। ঠিক নয়, এই কর্মবিরতি। পাশাপাশি অ্যাডভোকেট জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আগামী সপ্তাহে রাজ্যকে জানাতে হবে, পুরো পরিস্থিতি সামলাতে কী ব্যাবস্থা নিয়েছে।

অন্যদিকে, শুধু রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজই নয়, এনআরএসের জুনিয়র ডাক্তারদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চিকিৎ?সকরাও। দিল্লির চলতি মাসে শুক্রবার সব পরিষেবা বন্ধের ঘোষণা ছিল আগে থেকেই। এনআরএসে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনকে সমর্থন করতে শামিল হয়েছে দেশের প্রায় সব রাজ্যের মেডিকেল কলেজগুলো। তার মধ্যেই ১৭ জুন সোমবার সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (আইএমএ)। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে, জরুরি ও রুটিন পরিষেবা চালু থাকবে। তবে আউটডোর এবং অন্যান্য পরিষেবা বন্ধ থাকবে। ফলে সোমবার সারা দেশেই চিকিৎসা পরিষেবায় ব্যাপক প্রভাব পড়তে চলেছে বলে খবর। শুক্রবারের কর্মবিরতিতে কার্যত শামিল হয়েছে গোটা দেশ। উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, মহারাষ্ট্র, কেরল, পঞ্জাব, বিহার, অসমসহ সব রাজ্যের মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকরা নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। কোথাও কাজ বন্ধ রেখে আন্দোলন হয়েছে। কোথাও বা রাস্তায় নেমে মিছিল করেছেন চিকিৎসকরা। ফলে এসব হাসপাতালে আউটডোর এবং জরুরি পরিষেবা কার্যত বন্ধ। সব মিলিয়ে এনআরএস আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশেই। বৃহস্পতিবার দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট মেডিকেল সায়েন্সেসের চিকিৎসকরা হেলমেট পরে এবং মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে প্রতীকী প্রতিবাদ করেছিলেন।

আরএনআরএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ঘটনা নিয়ে নিজের জেদে গোঁ ধরে বসে থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আরো বিপদ ডেকে আনছেন, তা পরিষ্কার করে দিয়েছেন অভিনেত্রী-পরিচালক অপর্ণা সেন। বলেছেন, তিনি কোনো দলের হয়ে নয়, একজন নাগরিক হিসেবে এনআরএসের আন্দোলনকারীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। অপর্ণা সেন বলেছেন, তিনি জানেন কোনো ডাক্তার কোনো দিন রোগীর জাত, ধর্ম বা বর্ণ দেখে চিকিৎ?সা করেন না। এই অচলাবস্থার জন্য রোগীরা যতটা কষ্ট পাচ্ছেন, অপর্ণা সেনে বিশ্বাস, প্রত্যেক ডাক্তার ততটাই কষ্ট পাচ্ছেন। তার অনুরোধ মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু রোগীদের নন, এই ডাক্তারদেরও মুখ্যমন্ত্রী। মমতা, এদের মায়ের মতো, অভিভাবক। একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের পূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রীও বটে।

 

"