জিনোম সিকোয়েন্সিং : শিশু রোগ নির্ণয়ে ‘বিপ্লব’ আসছে

প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

জিনোম সিকোয়েন্সিং বা ডিএনএর ক্রমবিন্যাসের মাধ্যমে বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের রোগ নির্ণয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যাবে বলে জানিয়েছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। আগামী বছর থেকে গুরুতর অসুস্থ ব্রিটিশ শিশু যারা কোন অজানা রোগে আক্রান্ত, তাদের জিনোম বিশ্লেষণ করা যাবে বলে জানা গেছে। কীভাবে কাজ করবে? জিনোম সিকোয়েন্সিং বা ডিএনএর ক্রমবিন্যাস হচ্ছে একজন মানুষের শরীরে থাকা তার সব জেনেটিক কোডকে একের পর এক বিন্যস্ত করা এবং অনুসন্ধান করা যে সেখানে কোথাও কোনো অসামঞ্জস্য ঘটেছে কি-না। এডেনব্রুক হাসপাতাল ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় একটি প্রকল্পের আওতায় এই কাজটি করা হচ্ছে। বিবিসি গতকাল মঙ্গলবার এ কথা জানায়। এই প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে দেখা যায় যে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা প্রতি চারজন শিশুর একজন জেনেটিক ডিসঅর্ডার বা জিনগত বৈকল্যের শিকার। বিরল এক জেনেটিক ডিসঅর্ডার নিয়ে জন্মেছিল সেরেন নামে এক শিশু। এ প্রকল্পে কাজ করার সময় গবেষকরা দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই জিনোম ক্রমবিন্যাস করে দিতে পেরেছেন এবং তার ভিত্তিতে অনেক ক্ষেত্রে এ শিশুটির চিকিৎসায় পরিবর্তনও আনা হয়েছে। জিনোম ক্রমবিন্যাসের ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিশু এবং তাদের বাবা-মা উভয়েরই জিনোম ক্রমবিন্যাস করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমেই দেখা হয়েছে যে, শিশুর জিনোমে কোথাও কোনো ত্রুটি ঘটে গেছে কি-না।

‘পরবর্তী প্রজন্মের শিশু’ নামের একটি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় এডনব্রোক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা প্রায় ৩৫০ জন শিশুর জিনোম ক্রমবিন্যাস করা হয়েছে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, শিশু মায়ের গর্ভে আসার সময়েই স্বয়ংক্রিয়ভাবেই জিনগত ত্রুটির বিষয়টি ঘটে গেছে। অর্থাৎ বাবা বা মায়ের এই ত্রুটি থাকার কারণে উত্তরাধিকারসূত্রে শিশুরা জিনগত ত্রুটিটি পায়নি বরং সেটি ছিল একটি স্বয়ংক্রিয় ঘটনা।

কোন ধরনের রোগ নির্ণয় করা যাবে? যে শিশুদের জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে তাদের মধ্যে জন্মগত অস্বাভাবিকতা, স্নায়বিক অসুস্থতা যেমন মৃগীরোগ, হজম সংক্রান্ত সমস্যা ও শরীরের বৃদ্ধি কম হওয়ার মতো রোগী ছিল। এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল জেনেটিক্স ও নিউরো ডেভেলপমেন্টের অধ্যাপক লুসি রেমন্ড।

গবেষক রেমন্ড বলেছেন, ‘এটি খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো জিনোম ক্রমবিন্যাস করে এখন একটা অর্থপূর্ণ ফল জানিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু আমার চিকিৎসক জীবনের শুরুতে একটা সামান্য জিন খুঁজে পেতে বছরের পর বছর লেগে যেত।’

অধ্যাপক রেমন্ড বলেছেন, ২০২০ সাল থেকে পুরো ইংল্যান্ডে জেনোমিক মেডিসিন সার্ভিস চালু হবে। অর্থাৎ কোনো শিশুর রোগ ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না এমন কোনো রোগ নিয়ে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি হলে তার জন্য জিনোম ক্রমবিন্যাস সেবা পাওয়া যাবে।

এটি চালু হলে ইংল্যান্ডই হবে পৃথিবীর প্রথম কোনো দেশ যেখানে এমন চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাবে। পরিবারগুলোর জন্য এর মানে কী? প্রথমত, খুব দ্রুত রোগ নির্ণয়। এটি ঘটেছিল মৃগীরোগে আক্রান্ত দুই বছর বয়সি শিশু মিলি মেই এর বাবা-মা ক্লেইরি কোল ও ক্রিস ডেলির ক্ষেত্রে। গত বছর, গুরুতর অবস্থায় মিলি মেইকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর তার বাবা-মাকে জিনোম ক্রমবিন্যাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

মিলি মেই এর মা ক্লেইরি বলেছেন, ‘আমার মেয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকতে থাকতেই আমাদের জিনোম ক্রমবিন্যাসের ফলাফল জানানো হয়েছিল। পরে এর ভিত্তিতেই একটি ওষুধে পরিবর্তন আনা হয়েছিল।’ কারণ সেই ওষুধটি ছিল তার মেয়ের যে ধরনের মৃগীরোগ সেটির জন্য ক্ষতিকর। ক্লেইরি বলেছেন, ‘ওষুধটা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বিরাট একটা পার্থক্য দেখ গেল।’ মিলি মেই এর বাবা ক্রিস বলছিলেন, তার মেয়ের যে জিনগত সমস্যা তৈরি হয়েছে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হয়েছে। বাবা-মায়ের থেকে মিলি মেইর কাছে এটি পরিবাহিত হয়নি।

অধ্যাপক রেমন্ড বলেছেন, এখন থেকে বাবা-মায়েদের আর রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের বিশেষজ্ঞের কাছে ছোটাছুটি করে একই কাহিনি বারংবার বলতে হবে না। বরং এখন সেই সময়টা তারা শিশুর পরিচর্যায় কাজে লাগাতে পারবেন।

এখন ১ হাজার পাউন্ডের চেয়ে কম অর্থে জিনোম ক্রমবিন্যাস করা যায়। এর ফলে, রোগ নির্ণয়ের জন্য বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে যে খরচ হয় তা কমে আসবে বলে মনে করছেন অধ্যাপক রেমন্ড।

জিনোম ক্রমবিন্যাসের ফলে পরিবারগুলো আর কী সুবিধা পাবে? কেটি ও পিকেনের মেয়ে সেরেন কেন মারা গিয়েছিল, তা জানা গিয়েছিল এই জিনোম ক্রমবিন্যাস থেকে। আর এর মাধ্যমেই তারা জানতে পেরেছিলেন যে, তাদের ছেলে রেইস রোগাক্রান্ত হয়নি।

সেরেনের জন্ম ২০১৭ সালে। আপাতদৃষ্টিতে সে সুস্থ-সবলই ছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সে অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে মাত্র ১৩ সপ্তাহের মাথায় সে মারা যায়। সেরেন ও তার বাবা-মায়ের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা ছিল। সেটাই পরে জিনোম ক্রমবিন্যাসের জন্য পাঠানো হয়। পরে, সেখানেই তার জিনগত একটি গুরুতর অসংগতির কথা জানা যায়।

পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে কেটি আবারও গর্ভবতী হলে এই দম্পতি এডেনব্রুক হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং গর্ভজাত সন্তান কোনো ঝুঁকিতে আছে কি-না জানতে চায়। সেরেনের ক্ষেত্রে মা-বাবা দুজনের থেকেই ত্রুটিযুক্ত জিন পরিবাহিত হয়েছিল। কিন্তু জানা যায় যে, কেটির গর্ভজাত সন্তানের কোনো সমস্যা হয়নি।

 

"