তৃণমূলে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে তৃণমূল

পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে উদ্বিগ্ন মোদি রাজ্যপালকে তলব

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৯, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

ক্রমেই দলের নিচুতলার ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর তার জেরে গত আট বছরে যা হয়নি, আজ সোমবার তা দেখতে হবে নেত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সন্দেশখালীতে চার বিজেপি কর্মী খুনের ঘটনায় রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠিকে ডেকে পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শ্রীলঙ্কা থেকে ফিরেই তিনি পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করবেন রাজ্যপালের সঙ্গে আর তখন মমতা কলকাতায় রাজ্য সচিবালয়ে গত আট বছরে সরকারি প্রকল্পের কাজ কী হয়েছে তার খতিয়ান নিতে। আর এর মধ্যেই ১৩ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে দলের জরুরি বৈঠক ডেকেছেন।

সন্দেশখালীতে তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষ ঘিরে রাজ্য রাজনীতি যখন উত্তাল, ঠিক তখনই দিল্লি গিয়েছেন রাজ্যপাল। গতকাল রোববার সকালে দিল্লির বিমান ধরেছেন রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠি। খবর, দিল্লিতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করবেন রাজ্যপাল। প্রশাসনিক বিষয় নিয়েই সেই বৈঠক। রোববারই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠক করেছেন কেশরীনাথ ত্রিপাঠি। সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক রয়েছে তার। প্রসঙ্গত, ফ্ল্যাগ খোলাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষে অগ্নিগর্ভ সীমান্ত লাগোয়া সন্দেশখালীর হাটগাছিয়া এলাকা। এখনো পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে চারজনের দেহ। সংঘর্ষে নিহত তৃণমূল কর্মী কাইয়ুম মোল্লার দেহ শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, উদ্ধার হয়েছে প্রদীপ ম-ল ও সুকান্ত ম-ল নামে ২ বিজেপি কর্মীর দেহ। কিন্তু উভয় পক্ষেরই দাবি, তাদের আরো অনেক কর্মী নিখোঁজ। তৃণমূলের দাবি, তাদের ৬ কর্মী নিখোঁজ রয়েছে। পাল্টা বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের দাবি, তাদের ৫ জন কর্মীকে খুন করা হয়েছে। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ চাইছে বিজেপি। ঘটনাটি মুকুল রায় জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। রাতেই সন্দেশখালীর ঘটনায় রাজ্য সরকারের কাছে রিপোর্ট তলব করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপরই গতকালই উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লি উড়ে গিয়েছেন রাজ্যপাল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতির বিচারে যা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

অভিযোগ, সন্দেশখালীর ভাঙ্গিপাড়ার এই ম-ল বাড়িতেই শনিবার হামলা চালিয়েছিল তৃণমূলের সশস্ত্র দুষ্কৃতবাহিনী। বাড়ি থেকে টেনে বার করে নিয়ে যায় পরিবারের মেজ ছেলে প্রদীপকে। তাকে তাড়া করে নিয়ে গিয়ে গুলি করে খুন করে দুষ্কৃতকারীরা। এদিকে, সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে হাটগাছিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে আর না বিগড়ে যায়, সে জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা। গ্রামে মোতায়েন করা হয়েছে প্রচুর পুলিশ। দুই বাড়িরই অভিযোগ, শুধু বিজেপি করার অপরাধেই এভাবে খুন করা হয়েছে প্রদীপ ও সুকান্তকে। প্রদীপের ভাই সন্দীপের অভিযোগ, তৃণমূলের বৈঠকটা ছিল একটা অজুহাত মাত্র। বিজেপি যেহেতু ওই অঞ্চলে বেশি ভোট পেয়েছে, তাই হামলা করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। গ্রামবাসী জানিয়েছে, এই অঞ্চলে তৃণমূলের একাধিপত্য কায়েম ছিল। কিন্তু লোকসভা ভোটের আগে থেকেই হাওয়াটা একটু একটু করে ঘুরতে শুরু করে। তৃণমূলের অনেক সমর্থকই বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। লোকসভা ভোটে তৃণমূলের গড় থেকে লিড নিয়ে বেরোয় বিজেপি। ফলে পরিস্থিতি ঘোরতর হতে শুরু করে সেখান থেকেই। শনিবার তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। রক্তাক্ত হয় হাটগাছিয়ার ভাঙ্গিপাড়া।

অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলায় অশান্তি পাকানোর উসকানি দিচ্ছেন বলে তোপ দেগেছেন বিজেপি নেতা মুকুল রায়। তিনি বলেছেন, সন্দেশখালীতে তৃণমূলের দুষ্কৃতদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন বিজেপির কর্মীরা। আরো অনেক কর্মী গ্রাম ছাড়া হয়ে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়ী করে ঘটনার দায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয়ও। পাশাপাশি, রাজ্যে বিজয় মিছিল নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গে মুকুল রায় প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতীয় দ-বিধির কোন ধারায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশ দিচ্ছেন? তা বলতে হবে। নইলে তার দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতে হবে তার রাজ্যে ল’ অ্যান্ড অর্ডার নেই। কেন্দ্র হস্তক্ষেপ করুক।

এই প্রেক্ষাপটে, গতকাল রোববার সন্দেশখালীতে তৃণমূলের তরফে পৌঁছান, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, সুজিত বসু, তাপস রায়, মাদান মিত্রের মতো দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণির নেতা। মমতা যেকোনো ছোটখাটো বিষয়ে মন্তব্য করেন কিন্তু সন্দেশখালী ইস্যুতে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি চুপ। মুখ খুলেছেন দলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়। কলকাতায় বসে বলেছেন, ভোটের পরে বিজেপি পরিকল্পিতভাবে রাজ্যে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে।

এ অবস্থায়, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার গড়ার সময় থেকে এখন পর্যন্ত সরকারি কাজের পর্যালোচনা করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ সোমবার বৈঠক ডেকেছেন। শুধু এক বছরের নয়, সোমবার নবান্ন সভাঘরে যে বৈঠক হবে, সেখানে তৃণমূল সরকারের ২০১১ সাল থেকে নেওয়া সব প্রকল্পের অগ্রগতির বিশ্লেষণ করা হবে। খবর, তৃণমূল সরকারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কাজকর্মের সঙ্গে বাম সরকারের অন্তত শেষ তিন বছরের কাজের তালিকাও তৈরি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনেকেরই ধারণা, এই প্রস্তুতি আগামী বিধানসভা ভোটকে মাথায় রেখেই। লোকসভা ভোটের ফলাফলে এক ডজন আসন কমেছে শাসকদল তৃণমূলের। বিপরীতে বিজেপির আসনসংখ্যা দুই থেকে একলাফে বেড়ে হয়েছে ১৮। অথচ, বিগত আট বছরে রাজ্যে বহু উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ করেছে তৃণমূল সরকার। প্রচারের পাশাপাশি সরাসরি তৃণমূলস্তরের মানুষদের কাছে সেই সব প্রকল্পের সুফল পৌঁছে দেওয়ার কাজও চলেছে। তার পরও ভোটে বিপরীত ফল কেন হলো, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে ফল প্রকাশের পর থেকেই। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও আরো গভীরে গিয়ে সেই বিশ্লেষণ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

 

"