পদ্মা পাড়ের মানুষের স্বপ্নপূরণের অপেক্ষা

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হওয়া যেন এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। কারিগরি কোনো জটিলতা না থাকায় দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে স্প্যান বসানো, এর সঙ্গে সঙ্গে সড়ক ও রেলের সø্যাব বসানোও। ফলে পদ্মা পাড়ের বাসিন্দাদের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। উন্নত অর্থনৈতিক অবস্থা, ঢাকার সঙ্গে সহজ সড়ক যোগাযোগ এবং নগরের মতো আধুনিক সেবার সুবিধাগুলো অপেক্ষা করছে দুই পাড়ের বাসিন্দাদের জন্য। এদিকে, সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে পদ্মার উভয় পাড় মুন্সীগঞ্জ, শরিয়তপুর ও মাদারীপুরে মোট ২ হাজার ৮৬৬ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ২ হাজার ৬৬ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়ে গেছে। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সাতটি পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের। এরই মধ্যে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় দুটি, মাদারীপুর জেলায় একটি ও শরিয়তপুর জেলায় একটি করে মোট চারটি পুনর্বাসন কেন্দ্র বানানো হয়েছে।

এসব কাজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভিটে-মাটি হারানো মানুষের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণে। প্রকল্প এলাকায় ভিটে-মাটি হারানো মানুষগুলো যেন পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভালো মতো বসবাস করতে পারেন, কোনোভাবেই যেন বাপ-দাদার হারানো ভিটে-মাটির কথা মনে না পড়ে, সে বিষয়ে সচেষ্ট সরকার।

এছাড়া পুনর্বাসনের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ৬৩২ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য মোট ২ হাজার ৫৯২টি প্লটটি করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৬৬৭টি ভূমিহীন পরিবারকে বিনামূল্যে প্লট দেওয়া হয়েছে। ৬৪৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ভিটে উন্নয়ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

একাধিক পুনর্বাসন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, প্রবেশপথেই রকমারি ফলজ, ওষুধি ও ফুল গাছের বাগান। প্রতিটি কেন্দ্রে একটি মসজিদ, একটি বাজার, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য একটি পানির ট্যাঙ্ক, একটি পুকুর, একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এছাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোকে যেন এক সবুজ বেষ্টনী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্রের সবুজ বেষ্টনীর মধ্যে দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করেন আক্কাস মাতবর ও শায়লা বেগম দম্পতি। আক্কাসের সেভাবে মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই ছিল না। তবে সেতু এলাকায় নামকাওয়াস্তে একটা ঠিকানা ছিল। অথচ সেই আক্কাস পুনর্বাসন এলাকায় প্লট নিয়ে বসবাস করছেন মনের আনন্দে।

আক্কাস বলেন, আমার কিচ্ছু ছিল না। শেখের বেটি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) পদ্মা সেতু করায় কোনো ট্যাকা-পয়সা ছাড়াই প্লট পাইছি। কুমারভোগ পদ্মা সেতু প্রাথমিক বিদ্যালয়। ডিএইচ বাদল ৪নং ওয়ার্ড কুমারভোগের বাসিন্দা ছিলেন ধলু মিয়া। তার সাড়ে ১৪ শতাংশ জমি সরকার পদ্মা সেতু প্রকল্পের আওতায় অধিগ্রহণ করেছে। বিনিময়ে কুমারভোগ পুনর্বাসন কেন্দ্রে ধলু মিয়াকে ৫ শতক জমি দিয়েছে। এছাড়া ক্ষতিপূরণ বাবদ নগদ ১৩ লাখ টাকা এবং প্রতি শতাংশ বাবদ ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করে দিয়েছে তাকে। ১৩ শতাংশ জমির পরিবর্তে যা পেয়েছেন তা নিয়ে সন্তুষ্ট ধলু মিয়া।

সম্প্রতি পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাওয়া-জাজিরা উভয় প্রান্তে পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং এ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অন্য কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। ত্রয়োদশ স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় বাঙালির স্বপ্নের সেতুর প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ। জাজিরা পয়েন্টে নদীশাসনের পাশাপাশি সংযোগ সড়ক, ওজন সেতু এবং টোল প্লাজার কাজও শেষ।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। তবে মাওয়া অংশের সংযোগ সড়ক এবং অন্য অংশের কাজ নিয়ে আরো অল্প কিছু সময় প্রয়োজন হবে। তবে সেটা যে অনেক বেশি সময়ের ব্যাপার নয়, তা-ও জানিয়ে দিচ্ছেন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, চ্যালেঞ্জিং ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো শেষ হয়ে যাওয়ায় বাকি কাজ বড় ধরনের জটিলতা ছাড়াই শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাজিরা প্রান্তের নাওডোবা গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সি বাসিন্দা জুলহাস পোদ্দার। সেতু প্রকল্পের পাইনপাড়া, করুলী চরে বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে বিক্রি করেন তিনি। চরগুলোতে থাকা প্রায় ২০টি দোকানের মধ্যে তার একটি। পদ্মা সেতুর কারণে নিজেদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের আশা দেখা এই প্রৌঢ় বলেন, নদীর পাড়ে থেকে শুধু নদীর পাড় আর জীবনের ভাঙন দেখেছি। পদ্মা সেতু হলে আমাদের ছেলেমেয়েরা সহজে ঢাকা যেতে পারবে। আবার যারা এখন ঢাকা থাকে, তখন তারা বাড়িতে থেকেও ঢাকার কাজ করতে পারবে। এখন আমরা এখানকার বাজারে আমাদের গাছের কাঁঠাল, আম, কলা এবং অন্যান্য জিনিস বিক্রি করি। পদ্মা সেতু হলে সরাসরি ঢাকা নিয়েও বিক্রি করতে পারব।

 

"