কিশোরগঞ্জে প্রতিবন্ধীকে নির্যাতন

আটক ১

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০১৯, ০০:০০

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি

কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের পূর্বদড়ি জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে সাবেক এক কাস্টমস কর্মকর্তার বাড়িতে ঢোকায় ‘চোর’ সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন এক তরুণকে বেঁধে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বৃহস্পতিবার সকালে মুখলেসুর রহমান খান শাহান নামে ওই কর্মকর্তার নির্দেশে এ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এ সময় নির্যাতিত তরুণের কান্না ও আহাজারিতেও মন গলেনি ওই কর্মকর্তার। তার পক্ষের লোকজন প্রকাশ্যে ওই তরুণকে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট নির্যাতন চালায়।

বাড়ির কেয়ারটেকার সাজ্জাদ হোসেন হিটলারকে লাঠি দিয়ে ওই তরুণকে মারধর করতে দেখা যায়। এ সময় আলম মিয়াসহ আরো কয়েকজনকে নির্যাতনে সহযোগিতা করতে দেখা গেছে। পরে স্বজনদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় তাকে। এদিকে নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও করে কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করলে বিষয়টি জানাজানি হয়। পরে ক্ষিপ্ত এলাকাবাসী বিকালে অভিযুক্তের বাড়ির সামনে গিয়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ ঘটনার পর নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগে সাজ্জাদ হোসেন হিটলারকে আটক করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে নির্যাতনের শিকার মানসিক ভারসাম্যহীন মোশাররফের বাড়িতে গিয়ে তার স্বজনদের সান্ত¡না দেন তাড়াইলের সহকারী কমিশনার ভূমি মোশাররফ হোসেন এবং ওসি মো. মুজিবুর রহমান।

বৃহস্পতিবার ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, হাত-পা বেঁধে এক তরুণকে মাটিতে ফেলে নির্মমভাবে পেটাচ্ছে একজন। পাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছেন গ্রামবাসী। পাশের চেয়ারে বসে পেটানো দেখছেন কয়েকজন বয়স্ক লোক। নির্যাতিত তরুণের চিৎকার, কান্না আর আহাজারিতেও থামছে না মারধর। পরে তাকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখতেও দেখা গেছে। নির্যাতনের সময় উপস্থিত কাউকে প্রতিবাদ বা ছেলেটিকে রক্ষায় এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি।

জানা গেছে, তাড়াইল উপজেলার তাড়াইল-সাচাইল ইউনিয়নের শামুকজানি গ্রামের পশু চিকিৎসক কেন্তু মিয়ার ছেলে মোশাররফ। দুই-তিন মাস আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায় তাকে বাড়িতে আটকে রাখা হতো। কিছুটা সুস্থ হওয়ায় ঈদের দিন থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ঈদের পরের দিন সকালে ভুলে পাশের গ্রাম পূর্বদড়ি জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে মুখলেসুর রহমান খান শাহানের বাড়িতে ঢুকে পড়ে ওই তরুণ। এ সময় শাহানের বাড়ির লোকজন চোর সন্দেহে তাকে ধরে ফেলে। পরে দড়ি দিয়ে বেঁধে শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে বাড়ির সামনে নির্যাতন চালায় মোশাররফের ওপর। ভয়ে উপস্থিত কেউ প্রতিবাদের সাহসও দেখায়নি। বাড়ির মালিক মুখলেছুর রহমান শাহানের নির্দেশে চলতে থাকে থেমে থেমে নির্যাতন। এ সময় তিনি একটি চেয়ারে বসে নির্যাতনকারীদের নানা নির্দেশনা দেন। খবর পেয়ে এলাকার লোকজনকে নিয়ে স্বজনরা ছুটে যান ওই বাড়িতে। তাদের সামনেও চলে আরেক দফা নির্যাতন। পরে দুপুরের দিকে মোশাররফের ভাই ও বাবার কাছ থেকে জোর করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় তরুণকে।

নির্যাতনের শিকার মোশাররফের ভাই মো. সাদ্দাম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার ছোট ভাই মানসিক প্রতিবন্ধী। এজন্য একমাস ধরে তাকে বাসায় আটকে রেখেছি। বাসা থেকে বের হতেও দিই না তাকে। ঈদের দিন আম্মার কান্নাকাটিতে তাকে বাসা থেকে বের হতে দিই আমরা। বৃহস্পতিবার কাস্টমস অফিসারের বাসায় গেলে তাকে সবাই মিলে বেঁধে প্রচন্ড নির্যাতন চালায়। আমরা খবর পেয়ে সেখানে যাই। তাদের হাতে-পায়ে ধরে মিনতি করি ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমার সামনেই অনেক মেরেছে আমার ভাইকে। আমার ভাই পাগল এলাকার সবাই জানেন। আমি এর বিচার চাই।

মোশারফের দাদি কমলা বেগম বলেন, ‘কীভাবে মারছে আমার ভাইডারে আপনেরা দেইখা যান। পাগল ছেরাডারেও এরা ছাড়ল না। কেমনে কাঁদছে আমার ভাইডা। আমার কইলজাডা ফাইট্টা যাইতাছে। আমরা গরিব বইলা ছেরাডারে এভাবে মারলো। আল্লাহ এর বিচার করো।’

এদিকে নির্যাতনের পর ক্ষিপ্ত এলাকাবাসী বিকালে ওই কর্মকর্তার বাড়ির সামনে গিয়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় তিনি বাসা থেকে বের হয়ে মোশাররফ ‘চোর’ বলে দাবি করেন।

মোশাররফের প্রতিবেশী জালাল মিয়া বলেন, ‘ছেলেটি অনেকদিন ধরেই মানসিক ভারসাম্যহীন। তাকে তো বাড়িতেই আটকে রাখা হয়। এমন একটি ছেলেকে যেভাবে ওরা মারলো তা চিন্তাই করা যায় না। আমরা এর বিচার চাই।’

অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই মা খুদেজা খাতুন ছেলেটিকে আরো বেশি আদর-যতœ করতেন। ছেলেটিকে এভাবে নিষ্ঠুর নির্যাতনের বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তার কান্নায় এলাকার অনেকেই সমবেদনা জানান তাকে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা মুখলেসুর রহমান খান শাহান সাংবাদিকের কাছে একটি বক্তব্য দিয়েছেন। রেকর্ড করা ভিডিওতে তিনি বলেন, আমার প্রাণনাশের চেষ্টায় তিনজন লোক আমার বাড়িতে এসেছিল। দুজন লোক পালিয়ে গেছে আর এই ছেলেকে ছাদ থেকে ধরা হয়েছিল।

তিনি দাবি করেন, ‘চুরি করতে আসায় ছেলেটিকে এলাকাবাসী একটু মারধর করেছে। তারপর তার বাবা ও এলাকাবাসী এসে বলেছে ছেলেটি মস্তিষ্ক বিকৃত। তারা মুচলেকা দিয়ে ছেলেকে নিয়ে গেছে।’

তাড়াইল থানার ওসি মো. মুজিবুর রহমান বলেন, এ নির্যাতনের ঘটনায় ওইদিন রাতে মোশাররফের ভাই সাদ্দাম হোসেন বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে তাড়াইল থানায় একটি মামলা করেছেন। একজনকে আমরা এরই মধ্যে আটক করেছি। অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, আমরা খবর নিয়ে জানতে পেরেছি ছেলেটি সত্যিই মানসিক ভারসাম্যহীন।

 

"