অবৈধ গ্যাস সংযোগ : বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

প্রকাশ : ২৭ মে ২০১৯, ০০:০০

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

তিন বছর গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার কথা থাকলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রতিদিনই নতুন গ্যাস সংযোগ হচ্ছে। মাইলের পর মাইল নতুন লাইন বসানো হচ্ছে। গ্যাস বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ বাখরাবাদ অসহায় হয়ে পড়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগকারী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কাছে। নাজেহাল হয়েছেন অনেক কর্মকর্তা। অফিস এমনকি বাসায় গিয়ে অস্ত্র দেখিয়ে হুমিক দেওয়া হয়েছে কাউকে কাউকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানটি এসব বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এতে অবৈধ সংযোগের স্বর্গ হয়ে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এই গ্যাস সংযোগ সিন্ডিকেট এতই ভয়ংকর যে, প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পায় না। আবার অন্য কথাও বলেছেন স্থানীয়রা। তারা মনে করেন প্রতি মাসে বড় অঙ্কের লেনদেন আছে এর পেছনে। তাই প্রশাসন এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না।

বাখরাবাদ কর্তৃপক্ষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫৩ হাজার ৯৪০ ফুট দৈর্ঘ্যরে ২৩টি অবৈধ গ্যাস লাইন চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি অবৈধ সংযোগ রয়েছে ৫ হাজার। কিন্তু অফিসের অন্য সূত্র মতে, অবৈধ সংযোগ সংখ্যা ৩০ হাজার। একদিকে কর্তৃপক্ষ অবৈধ লাইন চিহ্নিত করছে অন্যদিকে মাইলের পর মাইল নতুন লাইন বসিয়ে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ ৩০ হাজার হয়ে থাকলে সরকার প্রতি মাসে রাজস্ব হারাচ্ছে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এই সংযোগ বৈধভাবে হলে সিকিউরিটি মানি হিসেবে প্রতিটি সংযোগ থেকে আসত ১৬০০ টাকা। ৩০ হাজার সংযোগে সিকিউরিটি মানি হিসেবে ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে সরকার।

২০১১ সাল পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাস বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ ছিল তিতাস। বাখরাবাদ গ্যাস সংযোগ দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়ার সময় আবাসিক গ্রাহক ছিল ১৪ হাজার। পরে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত আরো ৮ হাজার সংযোগ দেয় বাখরাবাদ। বৈধ গ্রাহক সংখ্যা ২২ হাজার। কিন্তু এই সময়ে বাখরাবাদ নতুন কোনো নেটওয়ার্ক করেনি বলেই জানান কর্মকর্তারা। বিশ্বরোড থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর এবং শহর থেকে দক্ষিণ দিকে রামরাইল পর্যন্ত কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক এবং শহর বাইপাস সড়কের দুই পাশে সর্বোচ্চ এক কিলোমিটার পর্যন্ত বাখরাবাদের গ্যাস নেটওয়ার্ক (সম্প্রসারণ লাইন) আছে বলে জানান তারা। অবৈধভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় ১০ কিলোমিটার পথের দুই পাশে এবং দক্ষিণ দিকে রামরাইল পর্যন্ত যত গ্রাম আছে সব জায়গায়ই গ্যাসের লাইন সম্প্রসারিত হয়েছে। গ্রামের পর গ্রামে স্থাপিত হয়েছে গ্যাসের অবৈধ নেটওয়ার্ক (সম্প্রসারণ লাইন)। এই সম্প্রসারণ লাইন থেকে শত শত বাড়িঘরে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। বাখরাবাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া গ্যাস বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত সুহিলপুরের কলামুড়ি কবরস্থান থেকে তাজুল ইসলামের বাড়ি পর্যন্ত ৪ হাজার ফুট, ঘাটুরা মামুন মোল্লার বাড়ি এলাকায় ৩ হাজার ফুট, দারমা ও নন্দনপুরে ৪ হাজার ফুট, কোনাহাটি-মাইঝহাটি জড়জড়িয়াপাড়া ও মালিহাতায় ৫ হাজার ফুট, রামরাইল থেকে শ্রীরামপুর পর্যন্ত ২ কিলোমিটার, সুহিলপুরের হাড়িয়ায় ৪ হাজার ফুট, তেলীপাড়ায় ৭ হাজার ফুট, গৌতমপাড়া কাঠবাড়িয়া দীলিপদাশের বাড়ি এলাকায় ৬ হাজার ফুট, এছাড়া সুহিলপুর তেলীহাটি, হিন্দুপাড়া, গৌতমপাড়া, কেন্দুবাড়ি এলাকায় প্রায় ৮ হাজার ফুট, রাজঘর, নাটাই, ভাটপাড়া ও আমতলীতে ৬ হাজার ফুট, রামরাইলের ভোলাচংয়ে ৩ হাজার ফুট, বুধলগ্রামে ৬ হাজার ফুট অবৈধ গ্যাস লাইন চিহ্নিত করেছে। এছাড়া বুধলবাজার থেকে তৈয়ব চেয়ারম্যানের বাড়ি পর্যন্ত, শালগাঁও-কালীসীমায় গ্রামে হাজার হাজার ফুট অবৈধ গ্যাস লাইন রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি অবৈধ লাইন বসানো হয়েছে সুহিলপুরে। এরপর বুধল ইউনিয়নে। সেখানে অবৈধভাবে সম্প্রসারণ করা গ্যাস লাইন থেকে হাজারের মতো সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া নাটাই ইউনিয়নের আমতলী, রাজঘর ও ভাটপাড়াতে ৩০০ ও বুধলের মালিহাতা প্রায় ১৫০ অবৈধ সংযোগ রয়েছে। খাটিহাতা ঈদগাহ রোড এবং খাটিহাতা গ্রামে ২ হাজার ফুট অবৈধ গ্যাস লাইন বসিয়ে ১৫০-এর মতো অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এক সপ্তাহ আগেও অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে সদর উপজেলার বুধল ইউনিয়নের খাটিখাতা গ্রামে। প্রায় প্রতিদিনই সংযোগ দেওয়া হচ্ছে কোনো না কোনো স্থানে।

বাখরাবাদের এক দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চক্রটি অফিসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। গ্রামে গ্রামে অবৈধ গ্যাস সংযোগের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এরা অনেক শক্তিশালী। তারা পাইপ আনছে, লাইন বসাচ্ছে, রাইজার উঠাচ্ছে। বিল বই দিচ্ছে। সবই করছে। প্রশাসনও শঙ্কিত। তিনি জানান, গত মাসের ১০ তারিখে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে অবৈধ লাইন অপসারণের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। অভিযানের দিন সদর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাকে ফোন করলে আসতে পারবেন না বলে জানান। বারবার জেলা প্রশাসকের সহায়তা চেয়েছি। কোম্পানির এমডিকে দিয়ে ডিসির কাছে ম্যাজিস্ট্রেট চাওয়া হয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য।

 

 

"