স্বেচ্ছাশ্রমে কৃষকের ধান কাটছেন শিক্ষার্থীরা

প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দাম কম হওয়ার কারণে দেশের অনেক জায়গার কৃষক ধান কাটছেন না। দুই-এক জায়গায় কৃষক ন্যায্য দামের দাবিতে ধানখেতে আগুনও ধরিয়ে দিয়েছেন। এ অবস্থা থেকে গরিব কৃষককে মুক্তি দিতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ধান কেটে দিচ্ছেন। একজন জেলা প্রশাসক (ডিসি) কৃষকের ধান কাটার ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবার মৌসুমের প্রায় শেষদিকে এসে কৃষকের খেতের ধান কেটে দেওয়ার ঘোষণা দিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। গতকাল বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে কৃষকের ধান কেটে দেওয়ার কথা জানানো হয়। এদিকে বিনা টাকায় ধান কেটে ঘরে তুলতে পারায় রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা গ্রামের কৃষক বাবুল প্রধান বেজায় খুশি। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ, শিক্ষক ও ছাত্রদের যেন খুব ভালো করেন।’

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের এক জরুরি সিদ্ধান্ত মোতাবেক জানানো যাচ্ছে, দেশজুড়ে ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় এবং মজুর স্বল্পতার কারণে বেশ কিছু অঞ্চলে কৃষকেরা পাকা ধান কাটতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমতাবস্থায় বাংলার দুঃখী–-অসহায় মানুষের শেষ ঠিকানা কৃষিবান্ধব নেত্রী, দেশরতœ শেখ হাসিনার আদর্শিক ভ্যানগার্ড বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সব ইউনিটকে (বিশ্ববিদ্যালয়/মহানগর/জেলা/উপজেলা/থানা/পৌর/ইউনিয়ন/ওয়ার্ড) নিজ নিজ এলাকায় কৃষকদের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পাশে থেকে ধান কাটাসহ সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হলো।

বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধিরা জানান, নিজের জমির ধান মাঠে, শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু দাম কম হওয়ায় কৃষক তা কাটছেন না। বরং দিনমজুরির দাম বেশি হওয়ায় অন্যের ধান কেটে বেড়াচ্ছেন। এ কথা জানতে পেরে বিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে ওই কৃষকের ধান কেটে দিয়েছেন। এ ঘটনা রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা গ্রামের। গত সোমবার শুধু ওই কৃষকের নয়, একই গ্রামের তিন কৃষকের ১ একর ২৩ শতক জমির ধান কেটে দিয়েছেন চতরা মাল্টিমিডিয়া ক্যাডেট স্কুল ও চতরা বিজ্ঞান ও কারিগরি কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল তারা এ গ্রামের আরো এক কৃষকের ধান কেটে দিয়েছেন।

বিদ্যালয়টির সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাদিবা প্রধান জানায়, সবাই মিলে খুব আনন্দে ধান কেটেছি। গরিব কৃষকের উপকার করতে পেরেছি। খুব ভালো লাগছে। অষ্টম শ্রেণির আইরিন আখতার জানায়, স্যারেরা আমাদের গরিব মানুষের ধান কেটে দিতে বলেন। আমরা খুশি হয়ে কেটে দিয়েছি।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাদিবা প্রধান ও আইরিন আখতার বোরোখেতের পাশ দিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করত। তারা ১৫ দিন ধরে খেয়াল করে, জমিতে ধান পাকলেও তা কেউ কাটছিলেন না। পাঁচ দিন আগে সেই ধান শিলা ও ঝড়-বৃষ্টিতে কিছুটা নষ্ট হয়েছে। বিষয়টি তারা প্রধান শিক্ষক কবিন্দ্র নাথ ভট্টাচার্যকে জানান। কবিন্দ্রও বিষয়টি খেয়াল করেন। বিষয়টি তিনি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চতরা বিজ্ঞান ও কারিগরি কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রব প্রধানকে জানান। পরে কবিন্দ্র ও আবদুর রব ওই খেতের চাষিকে খুঁজে বের করেন। তার নাম বাবুল প্রধান। ওই দুজন বাবুলের কাছে ধান না কাটার কারণ জানতে চান। বাবুল প্রধান ওই দুজনকে জানান, অর্ধেক ফসল দেওয়ার বদলে তিনি একই গ্রামের আবু জোয়াদের ৫০ শতক জমি ঠিকা নিয়ে ধান লাগান। কিন্তু বাজারে ধানের দাম নেই। তাই নিশ্চিত লোকসানের ভয়ে তিনি ধান কাটছেন না। বরং এখন কৃষি শ্রমিকের মজুরির দাম বেশি। এ কারণে তিনি অন্যের জমির ধান কেটে বেড়াচ্ছেন।

বিদ্যালয়টির সূত্রে আরো জানা যায়, কবিন্দ্রনাথ ও আবদুর রব বিষয়টি নিয়ে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। তখন সবাই মিলে বাবুলের জমির ধান স্বেচ্ছাশ্রমে কেটে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। গত সোমবার পাঁচ শিক্ষকসহ ৭১ জন শিক্ষার্থী বাবুলের ৫০ শতক জমির ধান কেটে ঘরে তুলে দেন। এ সময় আশপাশের আরো দুই গরিব কৃষক সবুজ মিয়া ও এবরা হোসেন নিজেদের জমির ধান টাকার অভাবে কাটতে না পারার বিষয়ে জানান। তখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাদের ৭৩ শতক জমির ধানও কেটে দেন।

"