মুঘল ঐতিহ্যের খাবার

কলকাতার জাকারিয়া স্ট্রিট

প্রকাশ : ২২ মে ২০১৯, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

রমজান মাসে কলকাতার অনেকেই জাকারিয়া স্ট্রিটমুখো হন। কিন্তু কে এই জাকারিয়া? কার নামে এই জাকারিয়া স্ট্রিট? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুরু করতে হবে নাখোদা মসজিদের গল্প থেকে। মধ্য কলকাতার চিৎপুর বড়বাজার অঞ্চলে নাখোদা মসজিদ, কলকাতার সব থেকে বড় মসজিদ। আগ্রায় মুঘল সম্রাট ফৌজয়ানের দরগার আদলে বানানো নাখোদা মসজিদের তোলেপুর থেকে গ্রানাইট দিয়ে ভিত্তিপ্রস্তর হয় ১৯২৬ সালে, যেখানে ১০ হাজার মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন। গুজরাটের কাচ্ছি মেমন জামাতের দুই নেতা আবদুর রহিম ওসমান এবং হাজী নূর মহম্মদ জাকারিয়া এই অসাধ্য সাধনের কাজটা করেছিলেন। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন যখন সিদ্ধান্ত নেয় ‘বড়া’ মসজিদের পরিবর্তনে তারা আরো বড় আরো সুন্দর মসজিদ নির্মাণ করবেন, তখন এই দুজন মানুষ এগিয়ে আসেন এবং তখনকার সময়ে ১৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করে নাখোদা মসজিদ নির্মাণ করেন। ‘নাখোদা’ পার্সি শব্দ, এর অর্থ হলো স্থানীয় জাহাজ বা লর্ড অব দ্য শিপ-ও বলে অনেকে। সিংহল, মালদ্বীপ থেকে আনা শঙ্খ এবং কড়ি বিক্রির টাকা থেকেই নাখোদা মসজিদ বানানোর অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। জাকারিয়া পদবি এসেছে আর্মেনিয়ার জাকার থেকে; যার অর্থ গড হ্যাজ রিমেম্বারড। এরপর, চিৎপুর রোড থেকে যে সরু রাস্তা মহম্মদ আলী পার্কে এসে মিশেছে, সেই সুরতি বাগান লেনকে চওড়া করে নাম দেওয়া হয় জাকারিয়া স্ট্রিট, ১৯২৮ সালে। কিন্তু খাদ্যরসিকরা কেন যান জাকারিয়া স্ট্রিটে বিশেষত এই রমজান মাসে?

তার আগে, আরেকটা ইফতার ডেস্টিনেশন বলতে হবে, ফিয়ার্স লেন। আগে নাম ছিল, ছুনাম গলি, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কলকাতা নামের ব্যুৎপত্তি বইতে উল্লেখ আছে, এই ছুনাম গলিতে মূলত লেবু বিক্রেতাদের বাস ছিল। ব্রিটিশরা আবার একে বলত, ছুনাগলি। ১৯১৫ সালে প্রকাশিত পি এম বাগচীর স্ট্রিট ডিকশনারিতে সেখানকার খাবারের দোকানের কথা উল্লেখ করা আছে।

১৯১৫ সাল, মানে ১০৪ বছর আগের কথা। কিন্তু দোকানগুলো আজও আছে। ১৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো দোকান আদাম ‘স’ কাবাব শপ। বর্তমান মালিকের নাম, সালাউদ্দিন নিয়াজী। নিয়াজী সাহেবের ঠাকুরদা, শুভানি মিঞা দোকান শুরু করেন, সালটা তিনি নিজেও বলতে পারেন না। তারপর ওনার বাবা, আদম এই দোকানের হাল ধরেন। বলা যেতে পারে, এটা বাবা আদমের জমানার দোকান। এই আদম সাহেবের নামেই দোকানের নাম, এখন সালাউদ্দিন নিয়াজী চালান দোকান, সঙ্গে ছেলেও।

‘আদাম স কাবাব শপ’-এ গত বছর অবধি বিফ সুতা কাবাব আর বিফ বোটি কাবাব পাওয়া যেত। সুতা কাবাবের দাম ২৫ টাকা করে, এ বছর সেটা ৩০ টাকা হয়েছে, আর বোটি কাবাব হয়েছে ৪০ টাকা। এবারে পাবলিক ডিমান্ডে প্রথম, চিকেন মালাই আর মটন সুতা কাবাবও বানানো শুরু করেছে। কাবাবের দোকান দেখে ভক্তি না হলে, সন্ধ্যার পর থেকে রাত ৮টা অবধি ভিড়, শহরের সব থেকে পুরোনো কাবাবের দোকানে।

এরপর ফিয়ার্স লেনের আরেকটি শতাব্দী প্রাচীন দোকান, হাজী আলাউদ্দীনের মিষ্টির দোকান। দোকানের পাশ দিয়ে গেলেই খাঁটি ঘিয়ের গন্ধ বলা যেতে পারে, ডেকে নিয়ে ভেতরে ঢোকাবে। ঢোকার পরই, খালি ছানা বড়ার বদলে মিষ্টি, গুলাবজামুন, হালুয়া দেখতেই হবে। শুরু হতে পারে, মেওয়া লাড্ডু দিয়ে, তারপর পাঁচ রকমের হালুয়া।

সাধারণত কলকাতায় বাংলা মিষ্টি পাওয়া যায়। হাজী আলাউদ্দীনের দোকানে কিন্তু মোঘলাই মিষ্টি। যারা মিষ্টি খেতে ভালোবাসে তাদের কাছে হাজী আলাউদ্দীন, একেবারে বেহেস্ত যাকে বলে। এরপর ১২ টাকা দামের ছোট খাঁটি ঘিয়ে ভাজা গুলাবজামুন। এবারে আরেকটু এগোলে, কলুতলা ক্রসিংয়ে আছে আল বাইক। ১৫ টাকায় হাফ আর ৩০ টাকায় ফুল শিক কাবাব। আমূল ক্রিম আর মাখন মাখিয়ে দেবে, হাতে যখন এসে পড়বে প্লেটটা, তখন গালিবের কথা বা লখনৌয়ের কথা মনে পড়ে যেতে পারে। মিলবে, চিকেন মালাই কাবাব ও ফুল তন্দুরি।

কলুতলা ক্রসিং থেকে বাঁ দিকে গেলে, ডান দিকে কলুতলা মসজিদ পেড়িয়ে একটু বাম হাতে এগোলে প্লেটে আর খুঁড়িতে সাজানো, ফিরনির গামলা। দাম মাত্র ১৫ টাকা। তবে কোয়ালিটি যা, তাতে অনেক দামি ফিরনিকে স্বাদে শুইয়ে দেবে। এবারে ফিরনির পর উল্টো দিকের রাস্তায় আরেকটা ফিরনির দোকান। দাম ২০ টাকা। সঙ্গে মালাই লস্যিও।

তারপর আবার ফিরে, কলুতলা ক্রসিংয়ে। সোজা সরু গলি বরাবর হাঁটতে থাকলে যে দোকানে ধাক্কা খাবেন সেটা হলো দিলশাদ ভাইয়ের কাবাবের দোকান। চার রকমের বিফ কাবাব বানান তিনি। দাম ২০ টাকা করে। খিরি কাবাব (গরুর দুধের বাটের মাংস থেকে বানানো), গোস্ত কা দহী কাবাব, মালাই কাবাব, সুতা কাবাব। দাম মাত্র ৮০ টাকা। একটু হাঁসফাঁস লাগলে, বাঁয়ে ফালুদা শরবতের দোকান। ১০ টাকায় ফালুদা শরবত। জলটা ঠিক ঠাক, পেট খারাপের কোনো সম্ভাবনা নেই। ফালুদার শরবত খাওয়া শেষ হলে সামনের দিকে নাক বরাবর হাঁটা। সামনেই মোড় পড়বে। মোড়ের মাথায় দোকান আল হাবিবি। গরুর মাংস নেই, এমন খাবারের দোকান। এই চত্বরে, সব দোকানেই, আফগানি, মালাই কাবাব আর ডবল ফ্রাইয়েড চিকেন, প্রায় কমন। একটু অন্যরকম জিনিসও পাবেন।

এর পরও পেটে খিদে থাকলে, কলুতলার ডান দিকে হাঁটা শুরু করে জাস্ট গুনে গুনে ৩০ পা। ডান হাতে দেখবেন ইয়া বড় আস্ত একটা রুই মাছ ঝুলানো। একটু দাঁড়াতে পারেন, মাছ ভাজা আর মুরগি ভাজা খাবার জন্য, দুটিই ৪০০ টাকা কেজি। দোকানের নাম, মুরাদাবাদী লাজিজ কাবাব। আবার সামনের দিকে ওই গুনে গুনে ১০০ ফুট হাঁটলেই আরেকটা মোড়। মোড়টাই হলো জাকারিয়া স্ট্রিটের সেই মোড় যা খাবারের ধ্যান ধারণার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

মোড়ের প্রথম দোকান তাসকিন। মেনু, মুর্গ চাঙ্গেজি আর মাহী আকবরী (মানে, কাতলা মাছ ভাজা)। সঙ্গে ৫৬০ টাকা কেজি ডবল ফ্রাইয়েড চিকেন। সব খাঁটি তেলেভাজা, তাই খুব বেশি অর্ডার না দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। মাহী আকবরী আবার তাড়াতাড়ি শেষ হয়, খেতে হলে একটু আগেই যেতে হবে। এই দুটির সঙ্গে তাসকিনের ফালুদা আর লস্যি, অবশ্যই। আগে তাসকিন, খালি রমজানের সময়ই, মুর্গ চাঙ্গেজি আর মাহী আকবরী বানাতো, এ বছর থেকে ওরা সারা বছর বানাবে আর খুব শিগগিরি তন্দুর আইটেমও শুরু করছে। তাসকিনের উল্টো দিকে একজন হালুয়া পরোটা নিয়ে বসে, দারুন খেতে, ওখানে না খেয়ে, বাড়ি নিয়ে এসে মাঝরাতে খিদে পেলে খান, নয়তো পরের দিন সকালে। ২০ টাকায় ২৫০ গ্রাম।

"